ছবি: সংগৃহিত।
‘আপনার ছেলের আইকিউ ভীষণ কমে যাচ্ছে।’ ‘আপনার বাবুকে দুধ-ডিম খাওয়ান।’- কোনো অভিভাবক বা শিক্ষককে এমন কথা বলতে শোনা যায়। কিন্তু বুদ্ধি কি সত্যিই চাল-ডালের মতো মাপা যায়? হাত-পায়ের পেশির মতো বাড়ানো যায় কি?
আধুনিক সমাজে বুদ্ধি বা ‘ইন্টেলিজেন্স’ বলতে বোঝানো হয় নতুন তথ্য আহরণের ক্ষমতা, অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে চলার ক্ষমতা। কিন্তু এর সুনির্দিষ্ট পরিমাপ আসলে কতটা বৈজ্ঞানিক?
আইকিউ বা বুদ্ধ্যঙ্কের ধারণা প্রথম আসে ফরাসি মনোবিদ আলফ্রেড বিনেই-এর মাধ্যমে ১৮৯৬ সালে। বুদ্ধ্যঙ্ক নির্ধারণের মূল সূত্র হলো- মানসিক বয়সকে প্রকৃত বয়স দিয়ে ভাগ করে ১০০ দিয়ে গুণ করা। যেমন, ৮ বছর বয়সী ছেলে যদি ১২ বছরের উপযোগী প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তার আইকিউ দাঁড়াবে ১৫০। কিন্তু এই পদ্ধতি সব শিশু বা পরিবেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। শহরের ছেলে, গ্রামের ছেলে বা ভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক পটভূমির শিশু একই প্রশ্নে সমানভাবে পারদর্শী হবে- এটি অসম্ভব।
বুদ্ধির বিকাশে দুটি প্রধান ফ্যাক্টর ভূমিকা রাখে- বংশগতি (হেরেডিটি) ও পরিবেশ (এনভায়রনমেন্ট)। একজন শিশুর বুদ্ধি তার আর্থ–সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই আইকিউ পরীক্ষা শুধু বংশগত সক্ষমতার মাপকাঠি নয়, এটি পরিবেশগত সুবিধা–অসুবিধার প্রতিফলনও।
আইকিউ পদ্ধতির অনৈতিক ব্যবহারও ইতিহাসে দেখা যায়। ব্রিটেন ও আমেরিকায় আইকিউ পরীক্ষার মাধ্যমে বর্ণভেদ ও শ্রেণি বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে। পশ্চিম ভারতীয় বা কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রদের নর্মাল স্কুলে ভর্তি হতে না দিয়ে সাব-নর্মাল স্কুলে পাঠানো, আইকিউকে বৈজ্ঞানিক আড়ালে বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার- এটি চরম উদাহরণ। ফলে কিছু শহুরে ও প্রগতিশীল দেশে আইকিউ তথ্য ছাত্র-রেকর্ডে লেখা নিষিদ্ধ বা আইনি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে।
অপরদিকে, ‘বিস্ময় বালক’ বা ‘প্রকাণ্ড আইকিউ’ সংক্রান্ত গল্পও আমাদের চোখে বড় বিস্ময় জন্মায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কিম উং ইয়ং মাত্র চার বছর আট মাস বয়সে ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস সমাধান করতে পারত, আইকিউ ২১০। ক্রিস্টোফার হিরাটার ছিলেন ২২৫ আইকিউ-র অধিকারী। কিন্তু জীবনের প্রকৃত পরীক্ষায় এ ধরনের শিশুদের অনেকেই সাধারণ মানুষদের মতোই জীবিকা, সামাজিক প্রভাব বা মনোযোগে সীমিত হয়ে যান।
অতএব, আইকিউ কোনো চূড়ান্ত বা একক মানদণ্ড নয়। এটি বুদ্ধির একটি মাত্র দিক প্রদর্শন করে, পুরো ব্যক্তিত্ব ও সৃজনশীল ক্ষমতার মানদণ্ড নয়। বাস্তব জীবনের জটিলতা, সৃজনশীলতা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিক বিচার- সবই বুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শেষমেষ, বুদ্ধি কোনো একক সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশ, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে মানুষ তার প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত ক্ষমতা দেখায়। আইকিউ শুধুই একটি নির্দেশক; সত্যিকারের বুদ্ধি আসে ব্যক্তির জীবনধারণ, চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীল প্রয়াসের মধ্য দিয়ে।