ছবি:রামনারায়ন রবিদাস।
জন্ম থেকেই আলো দেখেননি রামনারায়ন রবিদাস। চোখে না দেখলেও জীবনের নির্মম বাস্তবতা তিনি হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছেন। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের পালকিছড়া চা-বাগানে টিনের চালার নিচে চার সদস্যের পরিবার নিয়ে তার প্রতিদিনের লড়াই শুধু টিকে থাকার। দীর্ঘদিন ধরে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভিক্ষা করে কোনোরকমে সংসার চালালেও মনে পুষে রেখেছিলেন একটাই স্বপ্ন- ভিক্ষার জীবন ছেড়ে সম্মানের পথে হাঁটবেন।
অনেক কষ্ট, লজ্জা আর অনিশ্চয়তা সয়ে এক লাখ টাকা ঋণ নেন রামনারায়ন। সঙ্গে যোগ করেন ঘরের শেষ সম্বল। সেই টাকায় কেনেন একটি অটোরিকশা। আশা ছিল, ছেলে সেটি চালাবে, ঘরে দু’মুঠো ভাত জুটবে, ভিক্ষার থালা নামিয়ে রাখা যাবে চিরতরে। কিন্তু সেই স্বপ্ন টিকেছিল মাত্র ছয় মাস।
গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে ঘুম থেকে উঠে উঠোনে এসে দেখেন তালা ভাঙা, অটোরিকশা উধাও। মুহূর্তেই যেন তাঁর জীবনে নেমে আসে আরও এক গভীর অন্ধকার। যে অটোরিকশাটি ছিল বেঁচে থাকার শেষ ভরসা, সেটিও চোরের হাতে হারিয়ে যায়।
বুধবার বিকেলে রামনারায়নের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিস্তব্ধ এক পরিবেশ। টিনের চালার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন পরাজিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। শরীরে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নেই, চোখে-মুখে ক্লান্তি আর অসহায়ত্বের ছাপ।
কাঁপা গলায় রামনারায়ন বলেন, ‘বড় অভাবে দিন চলে। ভিক্ষা করেই সংসার চলতো। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা লোন নিয়ে রিক্সাটা কিনছিলাম। ভাবছিলাম, আর ভিক্ষা করতে হবে না। ছেলে চালাবে, সংসার চলবে। কিন্তু আল্লাহ আর সে সুখ দিলেন না।’
এই কথাগুলো বলতেই তাঁর কণ্ঠ ভেঙে আসে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।
পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বাসমতি রানী রবিদাস শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘এই অটোরিক্সাটাই আছিল বিপদের ভরসা। মনে করছিলাম, আর ভিক্ষা করবো না। সংসারটা একটু দাঁড়াইবো। সব শেষ হয়ে গেল। চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল।’
রামনারায়নের কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে বেশি হতাশা। তিনি বলেন, ‘পুলিশরে জানাইয়া লাভ কী? এলাকায় কত গরু চুরি হইছে, কোনটার খবর মিলছে? আমারটা কীভাবে পাইবো?’
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে শরিফপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২৫টি গরু চুরি হয়েছে। একটি গরুও উদ্ধার হয়নি। এতে চোরদের সাহস বেড়েছে, আর সাধারণ মানুষের আতঙ্ক বাড়ছে।
এ বিষয়ে কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত পরিতাপের। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রামনারায়নের বাড়িতে পুলিশ খোঁজ নিতেও আসেনি বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য গনেশ গোয়ালা বলেন, ‘অন্ধ চোখে যে মানুষটি একটু আলোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আলো চোরের হাতে নিভে গেছে।’
ভিক্ষামুক্ত জীবনের স্বপ্ন দেখা জন্মান্ধ রামনারায়নের সামনে এখন শুধুই অনিশ্চয়তা- আরও একবার বেঁচে থাকার লড়াই শুরু হলো অন্ধকারেই।