সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির চিত্র উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বিভাগজুড়ে ৩৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬৪ জন নিহত এবং ৮৭২ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভাগে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে সিলেট জেলায়। আর উপজেলার হিসাবে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
২০২৫ সালে সিলেট জেলায় ১৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত এবং ২৯৯ জন আহত হন। জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর মধ্যে সিলেট–তামাবিল সড়কে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৯ জন, সিলেট–ভোলাগঞ্জ সড়কে ২৭টি দুর্ঘটনায় ২৭ জন, সিলেট–জকিগঞ্জ সড়কে ২৮টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন এবং সিলেট–এয়ারপোর্ট সড়কে ৭টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত হয়েছেন। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে জৈন্তাপুর উপজেলায় ২২টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন, দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় ২২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন এবং জকিগঞ্জ উপজেলায় ২১টি দুর্ঘটনায় ১৭ জন প্রাণ হারান।
সুনামগঞ্জ জেলায় ৬৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও ১৭০ জন আহত হন। এ জেলার মধ্যে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ২১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন এবং ছাতক উপজেলায় ১২টি দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়েছেন।
মৌলভীবাজার জেলায় ৫৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬০ জন নিহত এবং ৭০ জন আহত হন। এর মধ্যে কুলাউড়া উপজেলায় ১২টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন, বড়লেখা উপজেলায় ৭টি দুর্ঘটনায় ১০ জন এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৯টি দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত হয়েছেন।
হবিগঞ্জ জেলায় ৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৯ জন নিহত ও ৩৩৩ জন আহত হন। জেলার মধ্যে মাধবপুর উপজেলায় ২১টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন, নবীগঞ্জ উপজেলায় ১৮টি দুর্ঘটনায় ১৯ জন, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় ১২টি দুর্ঘটনায় ১২ জন এবং বাহুবল উপজেলায় ১১টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
নিসচার প্রতিবেদনে মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ৩৩টি দুর্ঘটনায় ৩৬ জন নিহত ও ৬৮ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে ৩২টি দুর্ঘটনায় ৩২ জন নিহত ও ১৪৪ জন আহত, মার্চে ২৯টি দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ৭৮ জন আহত, এপ্রিলে ২৯টি দুর্ঘটনায় ৩০ জন নিহত ও ৪২ জন আহত, মে মাসে ৩৩টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত ও ৮২ জন আহত হন। জুনে ২৯টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও ৪৮ জন আহত, জুলাইয়ে ২৬টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত ও ৬১ জন আহত, আগস্টে ২৬টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত ও ৮২ জন আহত, সেপ্টেম্বরে ৩২টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ৩০ জন আহত, অক্টোবরে ২৮টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও ১১০ জন আহত, নভেম্বরে ২৬টি দুর্ঘটনায় ২৫ জন নিহত ও ৬৬ জন আহত এবং ডিসেম্বরে ৩৩টি দুর্ঘটনায় ৩৭ জন নিহত ও ৬১ জন আহত হন।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ছিলেন ১৩২ জন। এছাড়া সিএনজি ও লেগুনার চালক ও যাত্রী ৬৬ জন এবং পথচারী ৮৬ জন নিহত হয়েছেন। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি উল্টে যাওয়া ৬২টি দুর্ঘটনায় ৪৭ জন, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছের সঙ্গে ধাক্কায় ২৪টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন এবং মুখোমুখি সংঘর্ষের ১২০টি দুর্ঘটনায় ১৩০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে চালকের সংখ্যা ১২২ জন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ২৭৩ জন পুরুষ, ৫৪ জন নারী এবং ৩৭ জন শিশু ছিলেন।
নিসচা কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট–চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মিশু মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানান, স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, অনুমেয় বা অপ্রকাশিত ঘটনা এবং নিসচার শাখা সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে প্রতিবছরের মতো এবারও এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিংয়ের ঘাটতি, ট্রাস্কফোর্সের সুপারিশ বাস্তবায়নের অভাব, চালকদের বেপরোয়া ও প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, লাইসেন্সবিহীন চালক, পথচারীদের অসচেতনতা, সিটবেল্ট ও হেলমেট ব্যবহার না করা, দীর্ঘ সময় বিরতিহীন গাড়ি চালানো, মাদকাসক্তি, সড়ক নির্মাণ ত্রুটি এবং মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং অদক্ষ চালকদের দ্বারা যানবাহন পরিচালনাকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে সিলেট বিভাগে ৩৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭৫ জন নিহত এবং ৭০৯ জন আহত হয়েছিলেন।