প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারী, ২০২৬ ১৮:৫০ (মঙ্গলবার)
নির্বাচনী প্রচারণায় পোশাক বদল, ধর্ম ব্যবহারে ভোট কি বাড়ে: বিবিসির প্রতিবেদন

ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী জনসংযোগে প্রার্থীদের পোশাকে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। উদারপন্থি থেকে বামপন্থি কিংবা স্বতন্ত্র-প্রায় সব পক্ষের প্রার্থীদেরই এখন টুপি, পাঞ্জাবি ও ঘোমটা পরে প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। কেবল পোশাক নয়, নির্বাচনী প্রচারে ধর্মের ব্যবহার নিয়েও উঠছে নতুন করে বিতর্ক।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের বিষয়টি নতুন নয়। অতীতে ধর্মভিত্তিক স্লোগান, পোস্টার কিংবা মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে ভোটারদের আকৃষ্ট করার নজির রয়েছে। তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বন্দোবস্তে’ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ভোটাররা করেছিলেন, নির্বাচনী জনসংযোগে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং এবারের নির্বাচনে ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের একাংশের অজ্ঞতাকেই রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও নির্বাচনী আচরণবিধিতে ধর্ম ব্যবহারের বিষয়ে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। বিধি অমান্য করলে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থাও আছে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও অনেক প্রার্থী আগেই নিজ নিজ এলাকায় জনসংযোগে নেমেছেন। এসব জনসংযোগের বড় অংশই হচ্ছে মসজিদ, শোকসভা বা ধর্মীয় জমায়েতে, যেখানে পুরুষ প্রার্থীদের টুপি-পাঞ্জাবি আর নারী প্রার্থীদের ঘোমটা পরতে দেখা যাচ্ছে।

বিএনপি, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ এবং স্বতন্ত্র- প্রায় সব ধরনের প্রার্থীর মধ্যেই এ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছেন ঢাকার এমপি পদপ্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সম্প্রতি তাঁর জনসংযোগের সময় একজন ব্যক্তি হঠাৎ তাঁকে টুপি-পাঞ্জাবি পরা নিয়ে প্রশ্ন করেন। এ সংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এ বিষয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচন এলেই এমন বিষয় সামনে আসে। সমাজের প্রভাবশালী অংশ-যেমন মসজিদ বা বাজার কমিটির নেতারা সাধারণত ধর্মচর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের সময় একটি সাংস্কৃতিক মিল তৈরি হয়। যেহেতু বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং ভোটারদের বড় অংশ মুসলমান, তাই এই বিষয়টি চলে আসে।’

অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা বরাবরই ধর্মীয় পোশাকে থাকলেও, নির্বাচনের সময় ধর্মের ব্যবহার আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ার আগে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের সমালোচনা করেছিলেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ সম্প্রতি এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, নির্বাচনী প্রচারণায় টুপির ব্যবহার বেড়েছে, যা নতুন কিছু নয়। এতে কাজ হয় বলেই স্মার্ট প্রার্থীরা এই কৌশল নেন।

তবে সরেজমিনে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই এই পোশাক পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী শাজেদুজ্জামান সৌমিক বলেন, এটি অনেকটা ভণ্ডামির মতো মনে হয়। লেবাস পরে ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ কাম্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রুমানা খাতুন বলেন,‘ তিনি ব্যক্তি দেখে ভোট দেবেন। তবে গ্রামীণ এলাকায় ধর্মীয় মানসিকতার কারণে পোশাক পরিবর্তন কার্যকর হতে পারে।’

নোয়াখালীর ব্যবসায়ী মোবারক বলেন, এসব আসলে লোক দেখানো; নির্বাচন শেষ হলে প্রার্থীরা আগের লেবাসে ফিরে যান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা মনে করেন, ধর্মীয় পোশাকের মাধ্যমে প্রার্থীরা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরি করতে চান। অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় ভোটারদের মন জয় করতে এই কৌশল নেওয়া হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, উপমহাদেশে ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক বহু পুরোনো। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭০ সালের নির্বাচন, এমনকি স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ধর্মের ব্যবহার দেখা গেছে। ফলে বর্তমান নির্বাচনেও ধর্ম ও পোশাকের এই ব্যবহার নতুন না হলেও, তা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক আগের চেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে।