প্রকাশিত : ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১৯:১৮ (শুক্রবার)
নির্বাচনে নাটকীয় মোড়: বিএনপির পক্ষে ফুলতলী-জমিয়ত, জোটে দুই প্রার্থী নিয়ে বিপাকে জামায়াত

ছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা। প্রতিদিনই বাড়ছে উত্তাপ, পাল্টে যাচ্ছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে ১১ দলীয় জোটের দুই প্রার্থী মাঠে নামায় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে টেনশন বাড়ছে। মাঠের পরিস্থিতি বলছে-এ আসনে এবার ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনাই সবচেয়ে প্রবল।

তবে পুরো নির্বাচনী মাঠে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ফুলতলী ও জমিয়ত সংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান। তারা এবার প্রকাশ্যে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের পক্ষে একযোগে মাঠে নেমে পড়েছেন। গ্রামের হাট-বাজারে, মসজিদ-মাদ্রাসায়, ঘরে-ঘরে তারা বিএনপির হয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাওয়ায় ভোটের পাল্লা স্পষ্টভাবেই বিএনপির দিকে ভারী হয়ে উঠেছে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এ আসনকে উন্মুক্ত রাখায় জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী আবু তাহির মোহাম্মদ আব্দুস সালাম মাদানী মাঠে নামলেও তাকে ঘিরে সংগঠনটির ভেতরেই তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। কারণ একই জোটে খেলাফত মজলিস থেকেও প্রার্থী হয়েছেন হাফেজ মাওলানা আব্দুল কাদির। ফলে জোটের ভেতরেই দুজন প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগাভাগির একটা বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এদিকে জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর আলম এবং এনপিপির মো. আজিজুল হকও সক্রিয় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে বিএনপি ছাড়া অন্য সব পক্ষের ভোট এখনই ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে-জোটের ভাঙন, ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থী আর ফুলতলী-জমিয়ত ধারার বড় অংশের প্রকাশ্য সমর্থন-এসব কারণে বিএনপির কলিম উদ্দিন মিলন শুরুতেই বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। ফুলতলী ও জমিয়তের প্রকাশ্য অবস্থান- নির্বাচনী অঙ্কে বড় পরিবর্তন ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলাজুড়ে ফুলতলী ও জমিয়ত অনুসারীদের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতেও তারা দলভেদে ভোট বিভক্ত করলেও এবার তাদের বড় একটি অংশ সমন্বিতভাবে কলিম উদ্দিন মিলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

গ্রামগঞ্জে গিয়ে দেখা গেছে- আলেম, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও ধর্মীয়-ধারার অনেক মানুষ বিএনপি প্রার্থীর প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। কেউ লিফলেট দিচ্ছেন, কেউ উঠান বৈঠক আয়োজন করছেন, কেউ আবার সামাজিক মাধ্যমে মিলনের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন- ‘বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, অভ্যুত্থান–উত্তর পরিবর্তিত পরিবেশ এবং বিএনপির প্রতি জনগণের সহানুভূতি মিলনে ভোটের শক্ত ভিত তৈরি করেছে।’

প্রার্থী–বিশ্লেষণ: কে কোথায় দাঁড়িয়ে?

কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন (ধানের শীষ) সবচেয়ে শক্ত অবস্থান বিএনপির তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন মিলন নির্বাচনপ্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেই ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন। দলীয় নেতা–কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তার প্রতি আস্থা লক্ষ করা যাচ্ছে।

তিনি বলেন গণতন্ত্রের জন্য আজীবন নির্যাতন–নিপীড়ন সহ্য করেছি। হামলা–মামলায় দেড় ডজন বার হয়রানির শিকার হয়েছি। কিন্তু জনগণের ভালোবাসা আমাকে আবার মাঠে ফিরিয়েছে। ইনশা’আল্লাহ এবারও জনগণ আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে।

জামায়াতের আব্দুস সালাম আল মাদানী (দাঁড়িপাল্লা)- জোটের দ্বিধায় ক্ষতিগ্রস্ত

জামায়াতের দীর্ঘদিনের কর্মীভিত্তি থাকলেও এবার ফুলতলী-জমিয়ত ও জোটের অংশবিশেষ বিএনপির দিকে ঝুঁকে যাওয়ায় তিনি স্পষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।

তার ভাষায়,লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলে আমিই জয়ী হবো। দক্ষিণ ছাতকে আমি একক শক্তি। খেলাফত মজলিসের হাফেজ মাওলানা আব্দুল কাদির (দেয়াল ঘড়ি)-জোট–দ্বন্দ্বে অসুবিধায় তিনি বলেন,জামায়াত-জোটের ভেতরকার দ্বন্দ্ব আমাদের জন্য বড় বাধা। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আশা করছি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শিগগিরই আসবে।

জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর আলম (লাঙ্গল)- অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা জাতীয় পার্টির জনসংযোগও মাঠে আছে। তিনি বলেন, ‘বিজয়ী হই বা না হই-মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাবো। তবে জনগণের সাড়া আমাকে উৎসাহিত করছে।’

অভ্যুত্থানের পর পাল্টে যাওয়া মাঠের সমীকরণ 

সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সারা দেশের মতো সুনামগঞ্জ-৫ আসনেও ভোটের পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলাদলি ও পুনর্গঠনের ভেতর বিএনপি দ্রুত মাঠে সংগঠিত হতে সক্ষম হয়েছে।

মিলন–মিজান সমন্বয়ে বিএনপি দিন–রাত প্রচারণা চালাচ্ছে- ৩১ দফা কর্মসূচি, ঘরোয়া সভা, উঠান বৈঠক,পোস্টার–লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগ, প্রচার মিছিল। স্থানীয় সচেতনরা বলছেন, মাঠে বিএনপির উৎসাহ ও সংগঠিত অবস্থান বেশি। উল্টো দিকে জোটে বিভক্তির ফলে মিলনের পাল্লাই এখন সবচেয়ে ভারী।’

এলাকার রাজনৈতিক ইতিহাস এই আসন ছাতক পৌরসভা, ১৩ ইউনিয়ন ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত। ১৯৮৮, ১৯৯৬ ও ২০০১-এই তিনবার এখানে বিজয়ী হয়েছিলেন কলিম উদ্দিন মিলন (বিএনপি)।

২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা পাঁচবার বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের মুহিবুর রহমান মানিক। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগের প্রচার দৃশ্যমান নয়, বরং তাদের অনুগত ভোটারদের একাংশও ভোটের অঙ্কে নতুন করে ভাবছেন বলে দাবি স্থানীয়দের। শেষ মুহূর্তে প্রার্থী সরে দাঁড়ালে বদলে যাবে পুরো সমীকরণ। জোট–রাজনীতির টানাপোড়েন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বজায় থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ১০-১১ দলীয় জোটের যেকোনো এক প্রার্থী (জামায়াত বা খেলাফত মজলিস) যদি সরে দাঁড়ান-তাহলে পুরো গণিতই বদলে যাবে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, ফুলতলী–জমিয়ত–বিএনপির সম্মিলিত প্রচারণা, জোটে বিভাজন এবং মিলনের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার কারণে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের ভোটযুদ্ধ এখন বিএনপির পক্ষে ভারী। শেষ পর্যন্ত ভোটের দিনই নির্ধারিত হবে-এই ত্রিমুখী লড়াই কোন দিকে মোড় নেবে