বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাবে। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে কেউ আর চাঁদাবাজির সাহস পাবে না এবং কোনো অফিস-আদালতে ঘুষের সুযোগ থাকবে না। তিনি শনিবার সিলেটে আয়োজিত জামায়াতে ইসলামীর শেষ নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে ঐতিহাসিক সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বিকেল ৩টা ১০ মিনিটের দিকে মঞ্চে উপস্থিত হন। এটি তফসিল ঘোষণার পর ডা. শফিকুর রহমানের প্রথম ও শেষ সিলেট সফর। সকালে তিনি হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জনসভায় বক্তব্য রেখে হেলিকপ্টারযোগে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে অবতরণ করে আলিয়া মাঠের জনসভায় যোগ দেন।
বক্তব্যের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান সিলেটি ভাষায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, "বহুত দিন পরে সিলেটি মাততাম ফারলাম। অতদিন খালি বাংলা মাতিছি। আফনারা ভালা আছইন নি?" তিনি সিলেটকে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী উল্লেখ করে বলেন, আমরা হযরত শাহজালাল (রহ.) এর উত্তরসূরি, যিনি অন্যায়, জুলুমতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার হাতে নিয়ে মজলুমের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
তিনি বলেন, গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ জুলুমের শিকারে পরিণত হয়েছে। আলেম-উলামা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের সদস্য, সাধারণ শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষ, কামার, কুমার, তাঁতী, জেলে কেউই এই জুলুমের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। সবচেয়ে বড় মজলুম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শুধু আল্লাহ তায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠার কথা বলার অপরাধে আমাদের খুন করা হয়েছে। এক এক করে আমাদের শীর্ষ ১১ জন নেতাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করা হয়েছে, ১০০০ সহকর্মী ও সহযোদ্ধাকে নির্মমভাবে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে, ৫০০০ সহকর্মীকে পঙ্গু করা হয়েছে এবং ৫০ লক্ষ ভাইবোনদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে বারবার জেলে পোরা হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, তাদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল এবং শেষ দিশাহারা সরকার তাদের নিবন্ধন বাতিল ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু যখন ২৪ আগস্ট আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই জাতির জীবনে একটু স্বস্তি দান করলেন, তারা কোনো মিছিল, মিটিং বা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েননি। তিনি বলেন, "আমরা ওই রাতে ঘোষণা করলাম, সংগঠন হিসেবে জামায়াতের উপর যত জুলুম করা হয়েছে, আজকের এই মুক্তির বিনিময়ে একজন জালিমের বিরুদ্ধেও জামায়াত দল হিসেবে কোনো প্রতিশোধ নেবে না। আমরা কথা রেখেছি।" তবে তিনি এও বলেন, যারা খুন, আহত ও গুম হয়েছেন, অবশ্যই আদালতে তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে এবং জামায়াত মজবুতভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন ও সহযোগিতা দেবে। তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, মামলা করতে গিয়ে একজন নিরপরাধ মানুষের নাম তালিকাভুক্ত করা যাবে না। সারাদেশে মাত্র ৭৫০টি মামলা হয়েছে এবং সব মামলায় একজনমাত্র আসামী আছে, দ্বিতীয় কোনো আসামী খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সিলেটের বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, খনিজ পদার্থের যে ভাগ ও হিস্যা পাওয়ার কথা, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিলেটবাসী পাচ্ছে না। সিলেটের সব জায়গায় এখনো গ্যাস পৌঁছায়নি এবং সিলেটের গ্যাস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সব জায়গায় নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায় না। সিলেটের নদীগুলো হত্যা করে কঙ্কাল ও মরুভূমি বানানো হয়েছে। বর্ষা এলেই নদী ভাঙনের কবলে অজস্র মানুষ পড়েন, আবার শুকনো মৌসুমে নদীতে পানি থাকে না। সিলেটবাসীর জন্য সুপেয় পানি পাওয়া আলাদিনের চেরাগের মতো। ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ও অব্যবস্থার কারণে বর্ষা এলেই সিলেট ডুবে যায়। মদ, গাঁজা, অস্ত্র সিলেটকে অস্থির করে রাখে। তিনি এই সমস্ত অপকর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, "প্রিয় বাংলাদেশের এক ইঞ্চি মাটির উপরে কেউ আর চাঁদাবাজির সাহস করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। আমরা যদি নির্বাচিত হই, কোনো অফিস, আদালত, কার্যালয়ে কারো ঘুষ নেয়ার সুযোগ হবে না, সাহস হবে না। সম্মানের সাথে সমস্ত নাগরিক বসবাস করার নিশ্চয়তা পাবেন।"
রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। রাষ্ট্র তার একান্ত প্রয়োজন পূরণ না করলে, সে যদি তার একান্ত প্রয়োজন পূরণের জন্য কোনো অপরাধ করে, রাষ্ট্রের ওই অপরাধের জন্য নাগরিককে শাস্তি দেয়ার অধিকার নেই। আগে তাকে সম্মানজনকভাবে বাঁচার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। তারপর যদি লোভের বশবর্তী হয়ে অপরাধ করে, তবে অবশ্যই তার বিচার হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৫৪ বছরে দেশের টাকা সকল আমলেই লুটপাট হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকার গত সাড়ে ১৫ বছরে সাড়ে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। তিনি বলেন, "জনগণের টাকা যারা চুরি করেছে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের দায়িত্ব দিলে আমরা তাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেবো না। ওরা দুনিয়ার যেখানেই থাকুক, রাষ্ট্র ওদের মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পেটের ভেতর থেকে নিয়ে আসবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সেই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে।"
প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি ৫৪ হাজার বর্গমাইলের এক ইঞ্চির উপর বেইনসাফি করতে পারবেন না এবং প্রতি ইঞ্চি মাটি তার পাওনা বুঝে নেবে বলে অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, যেই এলাকা যত বেশি বঞ্চিত, সেই এলাকাতেই সর্বপ্রথম উন্নয়নের কাজ শুরু হবে।
প্রবাসী নির্ভর সিলেটে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থাকা সত্ত্বেও সকল এয়ারলাইন্সের ক্রাফট কেন এখানে নামে না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, "সিলেটের প্রবাসীরা বাংলাদেশের রেমিট্যান্সে বিশাল অবদান রেখে চলেছেন। আমরা তাদেরকে কথা দিচ্ছি, এই ওসমানী বিমানবন্দর নামে নয়, কাজে আন্তর্জাতিক হবে।" ইউকেতে থাকা ৯০ শতাংশ সিলেটি বংশোদ্ভূত উল্লেখ করে তিনি ম্যানচেস্টারে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট পুনরায় চালু এবং নতুন রুট চালুর অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিমানের নিউইয়র্ক যাওয়ার সক্ষমতা নেই, কিন্তু তারা এগুলো চালু করবেন।
তিনি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসীদের কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, যারা বেশি আয়-রোজগার করতে পারেন না এবং যাদের ভাগ্যে ওই দেশেই ইন্তেকাল জুটে যায়, তাদের লাশ নিয়ে ঠেলাধাক্কা শুরু হয়। তিনি বলেন, "তাকে বলবেন রেমিট্যান্স যোদ্ধা, আবার ইন্তেকাল করলে তার কোনো অভিভাবক থাকবে না, তা আমরা মানতে রাজি নই।" জামায়াত সরকার ক্ষমতায় গেলে বিদেশে আয়-রোজগার করার আগেই মৃত্যুবরণকারী প্রবাসীদের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখবে এবং তাদের পরিবারের দায়িত্ব নেবে। রাষ্ট্রীয় খরচে তাদের লাশ সম্মানের সাথে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি বলেন, জীবনে প্রথমবারের মতো এবার প্রবাসীরা ভোট দিয়েছেন, যার আওয়াজ জামায়াতই প্রথম তুলেছিল।
বাংলাদেশের নদী নিয়ে তিনি বলেন, "নদীগুলো মরে আছে, কারণ নদীর হক দেয়া হয়নি। তার পেট ভরিয়ে তোলা হয়েছে, দখল করা হয়েছে, আবর্জনা দিয়ে শেষ করে ফেলা হয়েছে।" তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বন্ধু দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের নদীগুলোও জীবন ফিরে পাবে এবং সুরমা, কুশিয়ারা যেন কেবল বইয়ের পাতায় না থাকে।
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা থেকে দেশের খাদ্যশস্যের ৫ ভাগের ১ ভাগ সরবরাহ করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই এলাকা অবহেলিত। তারা এসব সমস্যার সমাধান করবেন এবং বাংলাদেশের যেসব এলাকায় জলজ, কৃষিজ সম্পদ বেশি, সেসব এলাকাকে একেকটি কৃষি শিল্পের রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলবেন। কৃষকদের হাতে অর্থবহ সরঞ্জাম তুলে দেবেন যাতে কম পরিশ্রমে তারা বেশি আয় করতে পারেন।
তিনি বলেন, "নামে মাঝি কাজে পাজি। জেলেদের নামে বিলগুলো কারা নেয়, আমরা জানি। আমরা নির্বাচিত হলে এই সমস্ত দুর্নীতির মূল আমার কেটে দেবো। জাল যার জলা তার, তা নিশ্চিত করা হবে।"
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও মেধাভিত্তিক রাজনীতি : সিলেটের চা বাগানের নারী-পুরুষদের চেহারার দিকে তাকানো যায় না উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাদের সন্তানরা চিকিৎসা পায় না, শিক্ষা পায় না, অনাদরে অবহেলায় বড় হয়ে একসময় কাজে লেগে যায়। কিন্তু তারা এই দেশের নাগরিক এবং তাদের দায়িত্ব সরকার নেবে।
তিনি বলেন, "আগামীতে কেবল রাজার ছেলে রাজা হবে, রাজার মেয়ে রাণী হবে, সেই ধারার রাজনীতি আমরা পাল্টে দিতে চাই। আমরা চাই একজন শ্রমিক ভাইয়ের, একজন চা বাগানের শ্রমিক ভাইয়ের সন্তানের যদি মেধা থাকে, তাহলে সে হবে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী ইনশাআল্লাহ। আমরা সেই বাংলাদেশ গড়তে চাই।"
নিজের সিলেটী পরিচয় তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমি সিলেটের সন্তান। আপনারা তো অনেকে সুযোগ দিয়েছেন। একবার আমাদেরকে সুযোগ দেন। আমরা কথা দিচ্ছি আপনাদের মালিক বনবো না, আমরা আপনাদের পাহারা দিবো চৌকিদারের কাজ করবো ইনশাআল্লাহ।"
সিলেটের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এতিমের মতো পড়ে আছে এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কোনো কার্যক্রম নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আপনারা সাহায্য করেন, যদি সুযোগ হয় আপনাদের সব দাবিগুলো বাস্তবায়ন হবে। ডাবল লাইনের ব্রডগেজ ট্রেন, বুলেট ট্রেন সবকিছু হবে ইনশাআল্লাহ। শুধু সিলেট হবে না, বাংলাদেশের জায়গায় জায়গায় হবে। তবে সিলেট আর বঞ্চিত হবে না।"
জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য রাখার পর একে একে সিলেটের বিভিন্ন আসনে জামায়াত ও তার জোটের বিভিন্ন প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। পাশাপাশি সিলেট-১ সংসদীয় আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ছাড়া জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারাও এতে বক্তব্য রাখেন। জনসভায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার মোট ১১টি আসনের জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যরাও জনসভায় উপস্থিত ছিলেন।