ছবি: সংগৃহীত
ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, সিলেটের ভোটারদের মনে ততই বাড়ছে এক অজানা আতঙ্ক। কারও ভয় ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে যদি হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হয়, কারও আশঙ্কা সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্র যদি নির্বাচনের দিনে সহিংসতায় ব্যবহার হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সিলেটসহ সারাদেশের থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ দেড় বছরেও পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, এখনো এক হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদ অধরা রয়ে গেছে।
এই বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার কোথায়, কার হাতে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য মজুত রয়েছে- সে প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই বাস্তবতা সিলেটসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকে উচ্চ ঝুঁকির অঞ্চলে পরিণত করেছে।
নিরাপত্তা সূত্র নিশ্চিত করেছে, সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। প্রায় নিয়মিতভাবেই সীমান্ত এলাকা, পাহাড়ি ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার হচ্ছে।
তবে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের পরিমাণ লুট হওয়া অস্ত্রের তুলনায় নগণ্য। এতে প্রশ্ন উঠছে- বাকি অস্ত্রগুলো কোথায়?
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকার ছয়টি থানা থেকে লুট হওয়া ১০১টি অস্ত্রের মধ্যে মাত্র ৮৫টি উদ্ধার হয়েছে। বাকি অস্ত্রের কোনো সন্ধান নেই। এছাড়া কত রাউন্ড গুলি লুট হয়েছে এর সঠিক হিসেব দিতে না-পারলেও ৫১১৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে বলে এসএমপির মিডিয়া সেল জানায়।
এছাড়া সিলেট মহানগরীতে কতটি অস্ত্রে লাইসেন্স আছে এবং কতটি জমা দেওয়া হয়েছে তার তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে পারেননি মিডিয়া সেলে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘লাইসেন্সধারী অনেকেই লাইসেন্স প্রত্যাহার করেছেন, আবার অনেক লাইসেন্স বাতিলও হয়েছে। তাই, এই মুহূর্তে এ সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে পারঝি না।’
এদিকে র্যাব-৯ সূত্র জানায়, গেল বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে সিলেট বিভাগ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৪২টি দেশী ও বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র, ১০৪ রাউন্ড গুলি, ০৬টি ম্যাগাজিন, ২৬৫৭০ গ্রাম বিস্ফোরক, ১৩৬টি ডেটোনেটর, ০১টি সাউন্ড গ্রেনেড, ০৫টি পেট্রোল বোমা, ১১টি ককটেল এবং বিপুল পরিমাণ এয়ারগানের গুলিসহ ১২৪টি এয়ারগান উদ্ধার করেছে।
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে র্যাব-৯। লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধারে সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) কে এম শহীদুল হক। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরোদমে নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম শুরু করেছে, যা ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে।
এদিকে জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, ১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে ৪টি পাইপগান ও ১১ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি জৈন্তাপুর থানার অভিযানে ১০টি এয়ারগান উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে ওসমানীনগর থানার পুলিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযানে ১টি দোনলা বন্দুক ও ১টি একনলা বন্দুক উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
নির্বাচনকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সিলেট জেলা পুলিশ। নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সকল ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী আখতার উল আলম। তিনি বলেন, জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে পুলিশের মোবাইল টিম দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রতিটি উপজেলায় স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন থাকবে।
এছাড়া জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের জন্য বডি ওয়ার্ন ক্যামেরার পাশাপাশি ড্রোন মোতায়েন করা হবে বলে জানান তিনি।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের আশঙ্কা থাকলেও জেলার ৭২২টি ভোটকেন্দ্রকে ঘিরে শক্ত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হবে। নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে জেলা পুলিশের সতর্ক প্রস্তুতি এখন পর্যন্ত শতভাগ নির্বাচন-বান্ধব। আলহামদুলিল্লাহ।’
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক নজরদারি, টহল কার্যক্রম ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সাধারণ জনগণসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেছে জেলা পুলিশ।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়- কেন দেড় বছরেও অস্ত্র উদ্ধার সম্পন্ন হয়নি? উদ্ধার অভিযানে কি গোয়েন্দা ব্যর্থতা রয়েছে? এই অস্ত্রের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রের কি কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আছে?
এই প্রশ্নগুলোর কোনোটিরই স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে সিলেটে অবৈধ অস্ত্রের ঝুঁকি বরাবরই বেশি। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। লুট হওয়া অস্ত্র ও সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র- এই দুইয়ের সমন্বয় নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার না হলে শান্তিপূর্ণ ভোটের নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন।
বিজিবি সিলেট সেক্টর জানিয়েছে, সীমান্তে ৯০টি প্লাটুন মোতায়েন করে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর যৌথ টহল বাড়ানো হচ্ছে।
কিন্তু নিরাপত্তা সূত্রের মতে, শুধু সীমান্ত পাহারা জোরদার করলেই সমস্যা সমাধান হবে না। থানা ও উপজেলা পর্যায়ে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের অগ্রগতি এখনো আশানুরূপ নয়।
নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোটার উপস্থিতির ওপর। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অস্ত্র ও বিস্ফোরকের ভয় ভোটকেন্দ্রের পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
সবকিছূ মিলিয়ে নির্বাচনের আগে অস্ত্র উদ্ধারে অগ্রগতি না হওয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়া অপরাধীদের হাতে লুট হওয়া অস্ত্রের অস্তিত্ব, সীমান্ত দিয়ে অব্যাহত অনুপ্রবেশ এবং উদ্ধার অভিযানের ধীরগতি- এই তিনটি বাস্তবতা একত্রে নির্বাচনকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এখনই কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা ও নাশকতার আশঙ্কা অস্বীকার করা যাবে না।