প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১৪:৩৩ (শনিবার)
সিলেটের ৬ আসনে জামায়াতের ভোটের উত্থান

ছবি: ইমজা নিউজ

সিলেটের ৬টি আসনের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলাম তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করেছে। কোথাও ৭ গুণ, কোথাও ২০ গুণ পর্যন্ত ভোট বৃদ্ধি দলটিকে ভবিষ্যতের নির্বাচনে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সিলেট অঞ্চলের রাজনীতিতে জামায়াতের ভূমিকা আগামী দিনে আরও নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। 

সিলেট-১: ১৭ হাজার  থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার প্রায় ৮ গুণ ভোট বৃদ্ধি  
সিলেট-১ আসন দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীকী আসন হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সময়ের ব্যবধানে জামায়াতে ইসলামীর ভোটব্যাংক ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনে দলটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বর্তমান কেন্দ্রীয় আমীর ডা. শফিকুর রহমান পেয়েছিলেন ১৭ হাজার ৫১৭ ভোট। সে সময় বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মালিক ৩৭ হাজার ৯০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এবং আওয়ামী লীগের ইফতেখার হোসেন শামীম পান ৩৫ হাজার ৪৭০ ভোট।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের ভোট কিছুটা বাড়ে। ডা. শফিকুর রহমান পান ১৮ হাজার ২৯ ভোট। তবে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ৫৯ হাজার ৭১০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাইফুর রহমান পান ৫৮ হাজার ৯৯০ ভোট। জাতীয় পার্টির বাবরুল হোসেন বাবুলও পান ৪০ হাজার ১৭৫ ভোট।
২০০১ সালের নির্বাচন থেকে জামায়াতে ইসলাম বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী সাইফুর রহমান ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল মাল আব্দুল মুহিত পান ৯৫ হাজার ৮৯ ভোট।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৩৬ ভোট পান এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী সাইফুর রহমান পান ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৬৭ ভোট।
২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী ড. এ কে আব্দুল মোমেন পান ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯৬ ভোট। জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর পান ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৫১ ভোট।
২০২৬ সালের আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে জামায়াত ও বিএনপি আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এতে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯৩৬  ভোট পেয়ে জয়ী হন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান পান ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮৩ ভোট।
এই ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখায় যে, ১৯৯১ সালে যেখানে জামায়াতের ভোট ছিল মাত্র সাড়ে ১৭ হাজারের মতো, সেখানে ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। অর্থাৎ তিন দশকে দলটির ভোট প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিলেট-১ আসনের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলাম ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ভোটের ধারাবাহিক বৃদ্ধি দলটির রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরছে। 

সিলেট-২: ৪ হাজার থেকে প্রায় ৩৯ হাজার, প্রায় ৯ গুণ বৃদ্ধি
সিলেট-২ আসন দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি আসন হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথমদিকে জামায়াতে ইসলাম এখানে দুর্বল অবস্থানে থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটি ধীরে ধীরে শক্ত ভোটব্যাংক গড়ে তুলেছে। সর্বশেষ নির্বাচনে জামায়াত-খেলাফত মজলিস জোটের প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে এই উত্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী লুৎফর রহমান জায়গীরদার পান মাত্র ৪ হাজার ৫৪২ ভোট। ওই নির্বাচনে জয়ী হন জাতীয় পার্টির মকসুদ ইবনে আজিজ লামা ৩৯ হাজার ১৫ ভোট। অন্যদিকে বাকশালের মো. লুৎফর রহমান পান ২২,০৮৭ ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহিবুর রহমান পান ১২,৩১২ ভোট। এই নির্বাচনে জামায়াত ছিল স্পষ্টতই দুর্বল শক্তি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল হান্নান পান ৬,৩৮২ ভোট। এ সময় আওয়ামী লীগের শাহ আজিজুর রহমান ৪২,২৬৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জাতীয় পার্টির মকসুদ ইবনে আজিজ লামা পান ৩৯,০৪৪ ভোট এবং বিএনপির প্রার্থী ইলিয়াস আলী পান ৩৮,৪৭৩ ভোট। জামায়াতের ভোট বাড়লেও তারা তখনও মূল প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি।
২০০১ সালের নির্বাচনে জামাত বিএনপির নেতৃত্বে ৪ দলীয় জোট প্রার্থী ইলিয়াস আলী ১,০৩,৪৬০ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহ আজিজুর রহমান পান ৫৫,২৯১ ভোট। এই নির্বাচনে জামায়াত আলাদাভাবে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারেনি।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শফিকুর রহমান চৌধুরী ১,০৯,৩৫৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এবং জামাত বিএনপির নেতৃত্বে ৪ দলীয় জোট প্রার্থী ইলিয়াস আলী পান ১,০৬,০৪০ ভোট। এই সময়টাতেও জামায়াত কার্যত জোট রাজনীতির আড়ালে ছিল।
২০১৮ সালের নির্বাচনে জামাত বিএনপির নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী মোকাব্বির খান পান ৬৯,৪২৩ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহিবুর রহমান পান ৩০,৪৪৯ ভোট এবং স্বতন্ত্র এনামুল হক সর্দার পান ২০,৭৪৫ ভোট। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেমহাজোটের লাঙল প্রতীকের প্রার্থী এ এম ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া পান ১৮,০৩২ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থান লাভ করে।
২০২৬ সালের আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে বিএনপি ও জামায়াত-খেলাফত মজলিস জোট আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এতে বিএনপির প্রার্থী তাহসীনা রুশদি লুনা পান ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। অন্যদিকে জামায়াত-খেলাফত মজলিস জোটের প্রার্থী মুনতাসির আলী পান ৩৮ হাজার ৬৩৫ ভোট।
এই ফলাফল রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ১৯৯১ সালে যেখানে জামায়াতের ভোট ছিল মাত্র সাড়ে চার হাজারের মতো, সেখানে ২০২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ৩৯ হাজারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ তিন দশকে জামায়াতের ভোট প্রায় নয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সিলেট-৩: ৮ হাজার থেকে ৭৫ হাজার, প্রায় ৯ গুণ বৃদ্ধি
১৯৯১ সালের নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনে জাতীয় পার্টির আবদুল মুকিত খান ৩৩,৪১৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। আওয়ামী লীগের আতিকুর রহমান আতিক পান ১৯,০৫৭ ভোট, বিএনপির শফি আহমেদ চৌধুরী পান ১৭,৪৭০ ভোট। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল বাসিত পান ৮,২৯৬ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী পান ৭,০৯৫ ভোট।
এই নির্বাচনে জামায়াতের ভোট ছিল সীমিত, তবে দলটির অবস্থান এই আসনে ছিলো একেবারেই নগন্য।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আবদুল মুকিত খান পান ২৬,৬৫৯ ভোট।
আওয়ামী লীগের মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী পান ২৬,১৬৮ ভোট এবং বিএনপির শফি আহমেদ চৌধুরী পান ২৫,৯৫৪ ভোট। জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল বাসিত পান ৬,৭৫৫ ভোট। এ সময় জামায়াত আগের নির্বাচনের থেকেও কম ভোট পায়। 
২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী শফি আহমেদ চৌধুরী ৫৫,৯৯৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী পান ৪৪,৩৪২ ভোট।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী ৯৭,৫৯৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে জামায়াত-বিএনপির চারদলীয় জোটের প্রার্থী শফি আহমেদ চৌধুরী পান ৫৪,৯৫৫ ভোট। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের প্রার্থী মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী পান ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৮৭ ভোট। জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী শফি আহমেদ চৌধুরী পান ৮৩ হাজার ২৮৮ ভোট।
২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত ও বিএনপি আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এতে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিক ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৫০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।  অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজু পান ৭৫ হাজার ৬৭৪ ভোট। এই ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ১৯৯১ সালে জামায়াতের ভোট ছিল মাত্র ৮ হাজারের মতো, সেখানে ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৭৫ হাজারের বেশি হয়েছে; প্রায় নয় গুণ বৃদ্ধি।

সিলেট-৪: প্রায় ২০ গুণ বৃদ্ধি 
সিলেট-৪ আসন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আধিপত্যপূর্ণ একটি নির্বাচনী এলাকা হিসেবে পরিচিত। তবে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুরুতে জামায়াতে ইসলামের উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য। সময়ের ব্যবধানে দলটি ধীরে ধীরে একটি উল্লেখযোগ্য ভোটভিত্তি তৈরি করেছে। সর্বশেষ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ভোট পাওয়ায় এই উত্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে আওয়ামী লীগের ইমরান আহমদ ২৩,০১৮ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির নাজিম কামরান চৌধুরী পান ১৪,৫০৮ ভোট এবং জাসদ (রব)-এর মনির উদ্দিন মাস্টার পান ১৩,০০৮ ভোট। এই নির্বাচনে জামায়াত এই আসনের কোনো প্রার্থীই দিতে পারেনি। আর ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি তখন ছিল প্রান্তিক পর্যায়ে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির সাইফুর রহমান ২৩,৯৪৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের ইমরান আহমদ পান ২২,৭২৫ ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী দিলদার হোসেন সেলিম পান ১৭,০০৯ ভোট। প্রথমবারের মতো নির্বাচনের অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল মান্নান পান ৩,০৯৫ ভোট।
২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী বিএনপির দিলদার হোসেন সেলিম ৬২,৩২৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের ইমরান আহমদ পান ৪৭,৬০৮ ভোট।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইমরান আহমদ ১,৪৪,১৯৮ ভোট পেয়ে জয়ী হন। অন্যদিকে জামায়াত-বিএনপির চারদলীয় জোটের প্রার্থী দিলদার হোসেন সেলিম পান ৯৮,৫৪৫ ভোট।
২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইমরান আহমদ পান ২,২৩,৬৭৭ ভোট। জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী দিলদার হোসেন সেলিম পান ৯২,৪৭৩ ভোট।
২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত ও বিএনপি আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এতে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী পান ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়নাল আবেদিন পান ৭১ হাজার ৩৯১ ভোট। 

১৯৯৬ সালে যেখানে জামায়াতের ভোট ছিল মাত্র ৩ হাজারের মতো, সেখানে ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৭১ হাজার ছাড়িয়েছে প্রায় ২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।সিলেট-৪ আসনের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, জামায়াতে ইসলাম ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যদিও দলটি এখনো আসনটি দখল করতে পারেনি, তবে ভোটের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি ভবিষ্যতে এই আসনে জামায়াতকে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

সিলেট-৫: ইসলামী শক্তির ঐতিহাসিক আধিপত্য আরও সুসংহত

সীমান্তবর্তী সিলেট-৫ আসন দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে জামায়াতে ইসলাম ও অন্যান্য ইসলামী দলের ভোটব্যাংক ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। সর্বশেষ আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর বিপুল ভোট এই উত্থানকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে সিলেট-৫ আসনে ইসলামী দলগুলোর প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। ইসলামী ঐক্য জোটের প্রার্থী ওবায়দুল হক পান ২৬,২৬৭ ভোট। আওয়ামী লীগের হাফিজ আহম্মদ মজুমদার পান ১৯,৬৮২ ভোট। জামায়াতের প্রার্থী ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী পান ১৫,২০৭ ভোট। বিএনপির হারিস চৌধুরী পান ১৪,৫৯৬ ভোট। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তুলনায় ইসলামী দলগুলোর সম্মিলিত ভোট ছিল বেশি, যা এ আসনের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট করে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার পান ২৯,৪৮৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জামায়াতের ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী পান ২৮,১২০ ভোট মাত্র ১,৩৬৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল রাকিব পান ১৫,০৫৪ ভোট এবং বিএনপির এম. এ. মতিন চৌধুরী পান মাত্র ৪,৮৬০ ভোট। এই ফলাফল প্রমাণ করে, জামায়াত তখনই সিলেট-৫ আসনে একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াতের ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী পান ৭৭,৭৫০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার পান ৫২,৮৮৫ ভোট।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার পান ১,০৯,৬৯০ ভোট। জামায়াত-বিএনপির জোট প্রার্থী ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী পান ৭৮,০৬১ ভোট। এই দুই নির্বাচনে জামায়াত জোট রাজনীতির মাধ্যমে আসনটিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করে।

২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমদ মজুমদার পান ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৫ ভোট। জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুক ধানের শীষ প্রতীকে পান ৮৬,১৫১ ভোট। ফলাফলে ব্যবধান থাকলেও প্রায় ৯০ হাজার ভোট জামায়াতঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তির সংগঠিত অবস্থানকে তুলে ধরে।
২০২৬ সালের আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে সিলেট-৫ আসনে ইসলামী দলগুলো আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং বিপুল ভোট অর্জন করে। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান পান ৭৯,৩৫৫ ভোট। জমিয়তে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক পান ৬৯,৭৭৪ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ চাকসু মামুন পান ৫৪,৬১৪ ভোট।
এই নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর সম্মিলিত ভোট এক লাখ ৪৯ হাজারেরও বেশি, যা প্রমাণ করে যে সিলেট-৫ আসনে ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি এখন প্রধান ফ্যাক্টরে পরিণত হয়েছে।
সীমান্তবর্তী ও ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল জনপদের কারণে ইসলামী রাজনীতির প্রতি ঝোঁক ঐতিহাসিকভাবে বেশি। সিলেট-৫ আসনের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ১৯৯১ সালেই যেখানে ইসলামী দলগুলোর প্রভাব দৃশ্যমান ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে তা পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে। 


সিলেট-৬: ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ প্রায় ৭ গুণ বৃদ্ধি
সিলেট-৬ আসন একসময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সময়ের ব্যবধানে এই আসনে জামায়াতে ইসলাম ধীরে ধীরে একটি শক্ত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী প্রায় বিএনপির সমপর্যায়ের ভোট পেয়ে তাদের উত্থানকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির শরফ উদ্দিন খসরু ৩৯,০৬৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। সিপিবির নুরুল ইসলাম নাহিদ পান ৩৩,৩৩২ ভোট। ইসলামী ঐক্য জোটের মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান পান ২০,৩৬৭ ভোট। জামায়াতের প্রার্থী ফজলুর রহমান পান ১৫,২৬৭ ভোট। এই নির্বাচনে জামায়াতের ভোট তুলনামূলক কম হলেও দলটির একটি স্থায়ী ভোটভিত্তি তৈরি হতে শুরু করে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ ৫৩,৯৬৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টির মো. মুজাম্মিল আলী পান ৩৪,৬৯১ ভোট এবং বিএনপির সৈয়দ মকবুল হোসেন পান ৩১,৯৭০ ভোট। জামায়াতের প্রার্থী এবার যিনি সিলেট-১ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী হাবিবুর রহমান পান মাত্র ১৪,১৬৩ ভোট। এ সময় সিলেট-৬ ছিল স্পষ্টতই আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি।
২০০১ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মকবুল হোসেন ৭৬,৫১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ পান ৭১,৫১৭ ভোট। ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কুনু মিয়া পান ২৭,৪৭৮ ভোট। বিএনপির আব্দুল হাসিব মাত্র ৬০৭ ভোট পেয়ে নবম হন। এই নির্বাচনে জামায়াত সরাসরি প্রার্থী না দিলেও তারা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন করেছিল। 

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ পান ১,৩৮,৩৫৩ ভোট। জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াতের হাবিবুর রহমান পান ৫১,৭৯৪ ভোট। বিএনপি থেকে বিদ্রোহ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মকবুল হোসেন পান ৪৮,৯৭৪ ভোট। এই নির্বাচনে জামায়াত জোটের অংশ হিসেবে বড় ভোটব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ পান ১,৯৬,০১৫ ভোট। জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী বিএনপির ফয়সল আহমদ চৌধুরী পান ১,০৮,০৮৯ ভোট।
২০২৬ সালের আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনে বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এতে বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী পান ১ লাখ ৯ হাজার ১০৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন পান ১ লাখ ১ হাজার ৫৫৯ ভোট।
১৯৯১ সালে যেখানে জামায়াতের ভোট ছিল মাত্র ১৫ হাজারের মতো, সেখানে ২০২৬ সালে তা বেড়ে এক লাখ ছাড়িয়েছে; প্রায় সাত গুণ বৃদ্ধি। সিলেট-৬ আসনের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একসময় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে জামায়াতে ইসলাম এখন একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।