প্রকাশিত : ০২ মার্চ, ২০২৬ ২১:২৩ (মঙ্গলবার)
বালাগঞ্জে বেপরায়া মাটিখেকো চক্র, ধ্বং স হচ্ছে কৃষিজমি

ছবি: সংগৃহীত

সিলেটর বালাগঞ্জে কৃষিজমি ধ্বংস করে অবাধে চলছে মাটি কাটার মহোৎসব। ফসল উৎপাদনের উর্বর জমি থেকে প্রকাশ্যে মাটি কাটার অভিযোগ ওঠলেও উপজেলা প্রশাসনের কার্যত কোনো তৎপরতা নেই। এতে দিনদিন সংকুচিত হচ্ছে আবাদি জমি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ ও গ্রামীণ অবকাঠামো। মাটি খেকো চক্র প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে অবৈধভাবে ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অবাধে চলছে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড। উপজেলার বিভিন্ন সড়ক মারত্মক ক্ষতি করে সারাদিনই মাটি বোঝাই ট্রাকগুলো চলাচল করছে। বৃষ্টিপাত শুরু হলে এসব সড়কে কাদা জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তো আছেই। শিশু-বৃদ্ধরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কৃষিজমি ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

উপজেলা কৃষি দপ্তর বলছে, জমির উর্বরতা শক্তি উপর থেকে ১৫-২০ ইঞ্চির মধ্যে থাকে। উপরের স্তরের মাটি সরিয়ে ফেলায় জমির উর্বরতা শক্তি পুরোপুরি বিনষ্ট হচ্ছে। যা ১০-১৫ বছরেও পুরণ হবে না।

জানা গেছে, বালাগঞ্জের এসিল্যান্ড জাকারিয়া হোসেন এখানে যোগদানের পর তিনি খুব দম্ভ করে বলেছিলেন, মাটি কাটা বন্ধে কোনো আপোষ নেই। পেশি শক্তি বা কোনো বিনিময়ে তিনি পাত্তা দেবেন  না। প্রয়োজনে মাঠে তাবু বানিয়ে রাতে পাহারা দিয়ে হলেও মাটি কাটা বন্ধ করবেন। কিন্তু তার কথার সাথে কাজের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।

অভিযোগ ওঠেছে, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে বেপরোয়া প্রভাবশালী দলের মাটিখেকো চক্র। তাই মামলা-হামলার ভয়ে স্থানীয়রা মুখ খুলছেন না, কোনো প্রতিবাদ করছেন না। ওই চক্র এসিল্যান্ড ও ইউএনওকে ম্যানেজ করে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। মাটিখেকোদের ফোন করে সরিয়ে দিয়ে এসিল্যান্ড লোক দেখানো অভিযান করেন বলে অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন।  

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা ঘুস দিচ্ছে মাটি কাটার সাথে সম্পৃক্ত কতিপয় ঠিকাদার চক্র। বিগত দিনে উপজেলা পরিষদ ডিজিটাল সেবা কেন্দ্রে থাকা (উদ্যোক্তা) শাহজান নামের এক যুবক ও উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা সফিকুর রহমান এই লেনদেন  ভাগবাটোয়ারার সাথে জড়িত রয়েছেন। শাহজান গত বছরও এমনটি করেছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে, শাহজান বর্তমানে উপজেলা পরিষদের কোনো দায়-দায়িত্বে না থাকলেও নিয়মিত অফিস করেন। বিভিন্ন অফিসের ফাইলপত্র ও গোপন নথি ঘাঁটাঘাটি করতে দেখা যায় তাকে।

এদিকে মাটি কাটার বিষয়ে তথ্য জানার জন্য উপজেলার একজন সাংবাদিক এসিল্যান্ডকে ফোন দেন। তথ্য না দিয়ে তিনি সাংবাদিকের সাথে ক্রুব্ধরুষ্ট হয়ে কথা বলেন। তথ্য চাওয়ায় মাটি কাটার এক ঠিকাদারকে ওই সাংবাদিকের পিছনে লেলিয়ে দেন তিনি। ওই ঠিকাদার এখন সাংবাদিকের সাথে আক্রোশী মনোভাব দেখাচ্ছেন বলে উপজেলার সাংবাদিকদের অভিযোগ। বিষয়টি সম্পর্কে এসিল্যান্ড জাকারিয়া হোসেন কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, নির্বাচনি কাজে ব্যস্থ থাকাবস্থায় হয়তো দু’এক জায়গায় মাটি কাটা হতে পারে, এখন বন্ধ আছে।   

বালাগঞ্জ ইউনিয়নের একজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, ‘গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে মাটি ব্যবসা করার জন্য বেশ কয়েকজন শ্রমিকসহ দুটি ট্রলি ভাড়া করি। থানা পুলিশ উৎকুচ দাবি করায় মাটি কাটতে না পেরে গাড়ি ও শ্রমিক বাবতে একদিনে ৩০ হাজার টাকা ভর্তুকী দেই। পরদির এসিল্যান্ড রাস্তা থেকে আমার এক ড্রাইভারকে ধরে নিয়ে যান। ড্রাইভারকে সারাদিন আটকে রেখে আমার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। জরিমানার টাকা না দিলে মামলা দিয়ে ড্রাইভারকে জেলে পাঠানোর ভয় দেখানো হয়, তাই মান-সম্মানের দিকে চেয়ে তাৎক্ষণিক ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করে সেই টাকা পরিশোধ করেছি। পুলিশকেও আলাদা টাকা দিয়েছি। পরে আমি আর মাটি কাটিনি। এখন সব দিকে রাতদিন মাটি কাটলেও কেউ বাধা দিচ্ছে না।’ আইন কী শুধু আমার জন্য প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় শতাধিক স্থানে আবাদযোগ্য কৃষি জমি থেকে অ্যাস্কেভেটর বা ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় সহস্রাধিক বাসা-বাড়ি বা নির্মাণাধীন বাড়িঘরের ভিটা ভরাট করা হয়েছে। বর্তমানে বালাগঞ্জ ইউনিয়নের হাসামপুর, গৌরীনাথপুর, আদিত্যপুর, গহরমলি, পুর্ব পৈলনপুর ইউনিয়নের জালালপুর, বোয়ালজুড় ইউনিয়নের বুরবুরি, চান্দাইরপাড়া, বাণিগাঁও, হুঁশিয়ারপুর, পূর্ব গৌরীপুর ইউনিয়নের ওসমানীগঞ্জ বাজার, পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের নলজুর, আজিজপুর, সারসপুর, দেওয়ানবাজার ইউনিয়নের জামালপুর, সুলতানপুর গ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে ফসলি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। মাটি কাটার শ্রমিকরা বলছেন, বসতভিটা ভরাট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের জন্য মাটি কাটা হচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসানের কাছে সুনির্দিষ্ঠ তথ্য ও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও তিনি এবিষয়টি এড়িয়ে  গিয়ে বলেন, সঠিক তথ্য বা অভিযোগ কেউ দিচ্ছে না, অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।