প্রকাশিত : ০৩ মার্চ, ২০২৬ ১৯:৪৫ (মঙ্গলবার)
ছাতক-সিলেট বিদ্যুৎ বিভাগে ১৫ বছরের মহালুট: প্রধানমন্ত্রী বরাবর অভিযোগ

ছবি: সংগৃহীত

ছাতক ও সিলেট বিদ্যুৎ বিতরণ ও বিক্রয় বিভাগে গত ১৫ বছর ধরে চলা ভয়াবহ দুর্নীতি, ঘুষবাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও সরকারি মালামাল আত্মসাতের বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে এক নাগরিকের লিখিত অভিযোগে।

গেলো মঙ্গলবার ছাতকের সেবুল মিয়া প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ সচিব, ডিএফআই এবং দুদক-এর মহাপরিচালকের কাছে ১৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় বিভিন্ন নথিপত্র ও পত্রিকার কাটিং।

অভিযোগে বলা হয়, ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া পুরাতন সরকারি তার, ট্রান্সফরমার, খুঁটি, কপার ও অ্যালুমিনিয়ামের কোনো মালামালই সরকারি স্টোরে জমা হয়নি। বরং ছাতক ও সিলেট বিভাগের কিছু প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ মদদে এসব মালামাল গোপনে পাচার করা হয়েছে।

উদ্ধারকৃত সরকারি মালামাল গায়েব-লুটপাটের অভিযোগ

অভিযোগে ভাঙারি ব্যবসায়ী শফিকুল ও সিরাজুল এবং তাদের নেটওয়ার্ককে এই লুটপাটের মূল কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা ভুয়া ভাউচার তৈরি করে কোটি কোটি টাকার মালামাল নিয়মিত পাচার করেছে বলে দাবি করা হয়। এমনকি ছাতকের হাজী শহীদ তালুকদার নিয়মিত ঢাকা মেট্রো–ড ১২–২৮৬৩ নম্বর ট্রাকে ৪০–৫০ ড্রাম নতুন তামার তারসহ বরাদ্দকৃত মালামাল ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পাচার হওয়া মালামালের বড় অংশ কুমিল্লা ও জাঙ্গালিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হয়েছে। অভিযোগে নির্দিষ্টভাবে নাম এসেছে ছাতক প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া ও সিলেটের চীফ প্রকৌশলী আব্দুল কাদেরসহ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের।

জাইকা প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম

২০১১ সালের জাইকা-অর্থায়িত ছাতক বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পে উচ্চমানের তামার তার সরিয়ে নিম্নমানের অ্যালুমিনিয়াম তার বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এতে প্রকল্পের শর্ত লঙ্ঘন হয় এবং সিন্ডিকেট বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। ফলে এলাকায় বিদ্যুৎ লাইনে বারবার ট্রিপিং ও দুর্বল সরবরাহের অভিযোগ বাড়ে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, তামার তার ভারতে পাচারে একটি রাজনৈতিক–ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল।

‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্পে ২৫-৩০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ

২০১৮ সালের ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্পে সিলেট অঞ্চলের ১৯টি আসনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে ছাতক, দোয়ারাবাজার, শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুর এলাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস-এ–র নেতৃত্বে হাজী শহীদ তালুকদার, প্রকৌশলী ফজলুর রহমান ফাহাদ, মাসুম আহমদ ও কামাল তালুকদারের বিরুদ্ধে ৪০০-এর বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে ২৫–৩০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।

এক বছরের প্রকল্প সাত বছরেও শেষ না হওয়ায় গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে বলে দাবি করেন অভিযোগকারী।

চাঁদা দাবিতে সেনা অভিযান, গ্রেপ্তার ২

দেওকাপন গ্রামের ইশাদ আলীর বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের নামে চাঁদা দাবি করলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। পরে ছাতক সেনা ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন শোয়েব বিন আহমেদের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে নগদ টাকাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় সাইদুল হক বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ তদন্ত শেষে হাজী শহীদ তালুকদারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, অর্ধকোটি টাকার সমঝোতার মাধ্যমে মামলাটি গোপনে নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।

রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়, স্থানীয় যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতার আশ্রয়ে সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি–বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে। এতে সৎ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং দুর্নীতির নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়।

বদলি ঘিরে তোলপাড়, গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত

গত ২ মার্চ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদেরকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট থেকে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্টে বদলি করা হয়। একইদিন বিউবো ঢাকার উপপরিচালক মোজাম্মেল বদলির আদেশ জারি করেন। এই বদলি ঘিরে ছাতক–সিলেটে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে বলে অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদের ও নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়ার ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগী গ্রাহক ও স্থানীয় নাগরিকদের দাবি- ২০১১–২০২৬ পর্যন্ত উদ্ধারকৃত সরকারি মালামালের পূর্ণাঙ্গ অডিট; ভাঙারি সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা; জাইকা ও ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির টাকা উদ্ধার; গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়কৃত ২৫–৩০ কোটি টাকা ফেরত এবং বদলি–বাণিজ্য বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ।

জাতির উন্নয়নযাত্রা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আগে ছাতক-সিলেট বিদ্যুৎ বিভাগের এই মহাদুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবনে- এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।