পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছিলেন একই গ্রামের ১১ জনসহ মোট ১৩ যুবক। তবে স্বপ্নের ইতালি আর যাওয়া হয়নি কারোরই। তাদের মধ্যে এক যুবক লিবিয়ায় পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন এবং বাকি ১২ জন লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে একটি চক্রের হাতে জিম্মি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। জিম্মিদের পরিবারের কাছে জনপ্রতি ২৬ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে।
জিম্মি থাকা যুবকদের স্বজনরা জানান, ইতালি যাওয়ার জন্য মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে প্রতিজনের ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকায় মৌখিক চুক্তি হয়েছিল। সেই টাকা পরিশোধ করার পর গত ২৮ জানুয়ারি তারা ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন। প্রথমে আবুধাবি, এরপর কুয়েত এবং সেখান থেকে মিসর হয়ে তাদের লিবিয়ায় নেওয়া হয়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সাগরপথে ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে ইতালিতে পাঠানোর কথা ছিল। তবে এর আগেই একটি চক্র তাদের জিম্মি করে ফেলে বলে অভিযোগ স্বজনদের।
স্বজনদের দাবি, এরপর থেকে জিম্মি থাকা যুবকদের নির্মমভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলে নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে পরিবারের কাছে ২৬ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। অপহরণকারীরা বাংলাভাষী লোকজন দিয়ে কথা বলিয়ে বিকাশে টাকা পাঠানোর জন্যও চাপ দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
জিম্মি থাকা ১২ জনের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন সুনামগঞ্জ জেলার, জামালগঞ্জ উপজেলার, ফেনারবাঁক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের নুরু মিয়ার ছেলে জীবন মিয়া (২৫), টুনু মিয়ার ছেলে আব্দুল কাইয়ুম (২৬), ফয়জুন নুরের ছেলে মনিরুল ইসলাম (২৪), শহীদ মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া (২৭), রাশিদ মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৮), বাচ্ছু মিয়ার ছেলে এনামুল হক (২৬), জলিল মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৯), এখলাছ মিয়ার ছেলে আমিনুল ইসলাম (২৫), রাশিদ আলীর ছেলে সফিকুল ইসলাম (৩২) ও আবুল কাশেমের ছেলে নিলয় মিয়া (২২)। এছাড়া পুলিশের হাতে আটক আছেন নুরু মিয়ার বড় ছেলে ইয়াছিন মিয়া (৩০)।
এ ছাড়া আরও জিম্মি আছেন সুনামগঞ্জ জেলার, জামালগঞ্জ উপজেলার, তেলিয়াপাড়া এলাকার আবুল হামজা এবং সাচনা গ্রামের আবুল কালাম। অন্য আরেকজন হলেন সুনামগঞ্জ জেলার, দোয়ারাবাজার উপজেলার, দোহালিয়া গ্রামের সোহেল মিয়া।
জিম্মি থাকা একাধিক যুবকের স্বজনরা জানান, নাজিমনগর গ্রামের শহীদ মিয়ার স্ত্রী দিলোয়ারা বেগম, তার ছেলে হুমায়ুন কবির এবং তাদের মেয়েজামাই একই উপজেলার কলকতখাঁ গ্রামের নজরুল ইসলামের মাধ্যমে ইতালি পাঠানোর কথা ছিল। প্রতিজনের কাছ থেকে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা নেওয়া হলেও তাদের কেউ ইতালি পৌঁছাতে পারেননি।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, অপহরণকারীরা প্রতিদিনই বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে যোগাযোগ করে নির্যাতনের দৃশ্য দেখাচ্ছে এবং মুক্তিপণের টাকা দাবি করছে। অনেক অনুরোধের পর অপহরণকারীরা জানায়, জনপ্রতি ১২ লাখ টাকা দিলে রোববার রাতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।
জিম্মি থাকা সফিকুল ইসলামের বাবা রাশিদ আলী বলেন, দ্বিতীয় রোজার দিন ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই। যাদের স্মার্টফোন আছে তাদের মোবাইলে ভিডিও কল করে টাকা দাবি করা হচ্ছে। জায়গা জমি বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠানো হয়েছিল, এখন তার জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে।
জীবন মিয়ার বাবা নুরু মিয়া বলেন, গ্রামের কয়েকজনের ওপর বিশ্বাস করে এত টাকা দেওয়া হয়েছিল। এখন ছেলে ও অন্যদের জীবন বিপদের মধ্যে রয়েছে। টাকা নেওয়ার পর দালালরা আর যোগাযোগ করছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আতাউর রহমানের বড় ভাই হারুন মিয়া বলেন, অনেক কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে দালালদের দেওয়া হয়েছিল। এখন মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে পরিবারগুলো গরু বাছুর বিক্রি করা এবং ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নাজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা ও ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরাম হোসেন বলেন, গ্রামের অনেক পরিবার এখন উদ্বেগে রয়েছে। জিম্মিদের মধ্যে তার আত্মীয়স্বজনও আছেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে দিলোয়ারা বেগম প্রথমে ওই যুবকদের বিদেশে পাঠানোর কথা স্বীকার করলেও পরে অভিযোগ অস্বীকার করেন। একপর্যায়ে তার এক আত্মীয় ফোনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বন্দে আলী বলেন, এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ থানায় পাওয়া যায়নি। তবে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে পরিবারের সদস্যরা দূতাবাসের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকুন নুর বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছেন। কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ না করলেও বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।