ছবি: সংগৃহীত
ক্ষমতাচ্যুত সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সিলেট বিভাগ ও ছাতকের বিদ্যুৎ খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে-এমন অভিযোগ উঠেছে। ‘বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ’ শীর্ষক প্রায় ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগে আলোচনায় এসেছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল মাত্র দুই বছর। কিন্তু ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প আট বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। উল্টো তিন দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ১ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা থেকে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি এবং পরে ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
দ্বৈত বিলের অভিযোগ
বিদ্যুৎ গ্রাহক, মাঠপর্যায়ের কর্মী ও প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ-একই কাজের জন্য দুই জায়গা থেকে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। প্রথম বিল নেওয়া হয়েছে সিলেট মেগা প্রকল্প থেকে এবং দ্বিতীয় বিল তোলা হয়েছে স্থানীয় ডিভিশন অফিস থেকে।
কাগজে-কলমে ৯, ১২ ও ১৫ মিটার খুঁটি বসানোর কথা ছিল দুই শতাধিক গ্রামে। কিন্তু বাস্তবে বসানো হয়েছে মাত্র কয়েকশ খুঁটি। অভিযোগ রয়েছে, বাকি খুঁটির বিলও দুই জায়গা থেকেই উত্তোলন করা হয়েছে।
৩,৬০০ খুঁটির বরাদ্দ, বসানো হয়েছে প্রায় ১,০০০
ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ-রাউলী সড়কের ৩৩ কেভি লাইনের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬০০টি খুঁটি। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, বসানো হয়েছে প্রায় এক হাজারের মতো খুঁটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, শত শত খুঁটি রাস্তার ধারে পড়ে নষ্ট হচ্ছে এবং অনেক খুঁটির সঙ্গে থাকার কথা থাকা তামার ড্যাম তার, ক্যাবল, নট–বোল্ট ও অ্যাঙ্গেল পাওয়া যায়নি।
স্টোরে নেই কোটি টাকার মালামাল
প্রকল্পে তামার ক্যাবল, ট্রান্সফরমার, কন্ডাক্টর, সুইচগিয়ারসহ বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ বরাদ্দ ছিল। কিন্তু স্টোর পরিদর্শনে এসবের বড় অংশ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, এসব মালামাল রাতারাতি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
২০০ কোটি টাকার সাবস্টেশন অকার্যকর
এই প্রকল্পের আওতায় ছাতক ও জগন্নাথপুর উপজেলায় রাউলী, লাফাজ সুরমা সিমেন্ট এলাকা, ইকরছই ও ভবের বাজারে চারটি সাবস্টেশন নির্মাণের কথা ছিল। এ খাতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ সাবস্টেশন এখনো কার্যকর হয়নি। বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায় এবং লোডশেডিং বেড়ে গেছে।
ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, নতুন বিদ্যুৎ লাইন ও ট্রান্সফরমার বসাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নতুন লাইন সংযোগে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ট্রান্সফরমার বসাতে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ৪০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অভিযোগ
২০১৮ সালে ছাতক–গোবিন্দগঞ্জ–রাউলী ৩৩ কেভি লাইনের কাজ দেওয়া হয় শওকত অ্যান্ড সন্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে। পরে তারা কাজটি অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেয়, যা নিয়মবহির্ভূত বলে অভিযোগ। পরে নতুন করে আবার ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকার এস্টিমেট করে কাজ দেওয়া হয় অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার নেওয়ার পর সেটিও আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রকল্পটি নিয়ন্ত্রণ করছিল প্রায় ২০ জনের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগে বিদ্যুৎ বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের নামও এসেছে।
দুদকের তদন্ত শুরু
এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন–এ লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদক জানিয়েছে, তারা প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তে মালামাল গায়েব, দ্বৈত বিল, অকার্যকর সাবস্টেশন, ঘুষ বাণিজ্য ও টেন্ডার সিন্ডিকেটের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির ফোনে কথা না বলে লাইন কেটে দেন।
অন্যদিকে বিউবিও প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চন্দন কুমার সূত্রধর বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিক নয়। তবে অনিয়ম থাকলে তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ছাতকের এক দোকানদার সেবুল মিয়া বলেন, ‘উন্নয়ন কোথায়? লাইন আগের মতোই নষ্ট, সাবস্টেশন বন্ধ, লোডশেডিং বাড়ছে। শুধু দুর্নীতির গল্পই শুনি।’
সচেতন মহলের দাবি, প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ অডিট, মাঠপর্যায়ে কাজের যাচাই এবং লুট হওয়া সরকারি অর্থ ও মালামাল উদ্ধার করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।