সিলেট সীমান্তজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় মানব পাচার নেটওয়ার্ক আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ঈদের ছুটিতে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ৯ দিনে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। সীমান্তপথে অবৈধ যাতায়াতের পাশাপাশি মানব পাচারের নতুন কৌশলও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
মানব পাচারের এই নেটওয়ার্ক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বেশি আলোচনায় আসে। তখন দলের বহু নেতা কর্মী সিলেট সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান। এর মধ্যেই সীমান্তে সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক আটক হওয়ার ঘটনা বড় ধরনের আলোড়ন তোলে। কিছুদিন কড়াকড়ির কারণে পাচারকারী চক্রের তৎপরতা কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময় আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে তারা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফাঁদে ফেলে নারী-পুরুষদের সিলেটে এনে পাচার করা হয় ভারতে। সিলেট যেনো শিকার হচ্ছে মানবপাচারের চক্রান্তে।
তদন্ত করে জানা গেছে, সিলেটের জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট সীমান্ত ঘিরে অন্তত কয়েকটি শক্তিশালী পাচারকারী দল কাজ করছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজের সন্ধানে আসা নারীদের তারা টার্গেট করে। উচ্চ বেতনের লোভ দেখিয়ে ঢাকায় থাকা চক্রের সদস্যরা এসব নারীকে সিলেটে পাঠায়। পরে সিলেটের পাচারকারীরা তাদের অবৈধভাবে সীমান্ত পার করিয়ে ভারতের সংশ্লিষ্ট চক্রের হাতে তুলে দেয়। অনেক নারীকে ভারতের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে বিক্রি করে দেওয়া হয়। কেউ কেউ জোরপূর্বক শ্রমিকের কাজেও বাধ্য হন।
এদিকে ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, উড়িষ্যা, কেরালা ও রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে বহু বাংলাদেশি বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে কাজ করছেন। দেশে যাতায়াত বা পুনরায় ভারতে ফেরার সময় এসব মানুষ পাচারকারী দলের সহায়তায় সীমান্ত পার হন। তবে মাঝে মধ্যে দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটকও হন তারা।
সর্বশেষ গত রবিবার (২২ মার্চ) জৈন্তাপুর থানাধীন ডিবির হাওর সীমান্তে ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় নারী ও শিশুসহ ১৮ জনকে আটক করে পুলিশ। একই সময় পাচারকারী দলের দুই সদস্যকেও আটক করা হয়। জৈন্তাপুর থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানিয়েছেন, আটক সবার বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা হয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার (২০ মার্চ) গোয়াইনঘাট উপজেলার প্রতাপপুর সীমান্তের নকশিপুঞ্জি মন্দিরঘাট এলাকায় দুই তরুণীকে পাচারের চেষ্টা চলাকালে মানব পাচারকারী দলের এক সদস্যকে আটক করে বিজিবি। আটক অভিযুক্ত আফছর গোয়াইনঘাট উপজেলার পান্থুমাই এলাকার জয়েন উদ্দিনের ছেলে। বিজিবি ৪৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. নাজমুল হক জানান, দুই তরুণীকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে।
এ ছাড়া কাজের প্রলোভন দেখিয়ে চার নারীকে ভারতে পাচারের ঘটনায় গোয়াইনঘাটের মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে র্যাব ৯ শনিবার (১৪ মার্চ) ভোরে আরও দুইজনকে আটক করে। আটককৃতরা সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার খাসিয়া খাওড় এলাকার মৃত রুপ মিয়ার ছেলে আব্দুল হান্নান, একই এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আলমগীর। ভুক্তভোগী নারীর মামলার পর র্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এই দুইজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের গোয়াইনঘাট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় মানব পাচারের বিস্তার রোধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।