প্রকাশিত : ২৭ মার্চ, ২০২৬ ১৯:০৫ (শনিবার)
সিলেটে মানব পাচারের কালো সাম্রাজ্য: নাম আসছে প্রভাবশালীদের

ছবি: সংগৃহীত

সিলেট বিভাগে মানব পাচার উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। সীমান্তবর্তী জেলা সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ এখন আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের শক্তিশালী ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযান, নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চললেও পাচার কার্যক্রম থামানো যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেটের সীমান্ত এলাকা ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী পাচার সিন্ডিকেট। ভিজিট ভিসার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে শ্রমিক পাচারের অভিযোগও রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন বছরে সিলেট বিভাগ থেকে প্রায় ২২০০ জন পাচারের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছেন ৫৩০ জন এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ৩১০ জনকে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও বিয়ানীবাজার সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি নারী ও শিশু পাচার করা হয়। অপরদিকে বিমানবন্দর ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র বিদেশগামী কর্মীদের টার্গেট করছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, এই পাচার নেটওয়ার্কে জড়িত রয়েছেন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অসাধু সরকারি কর্মকর্তারাও। চক্রটির অন্যতম মূল হোতা হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী-এর নাম উঠে এসেছে। তাকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তার মালিকানাধীন ‘ফাইভ স্টার এন্টারপ্রাইজ’-এর আড়ালে সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজার এলাকার অন্তত ১২টি ট্রাভেল এজেন্সি সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের তালিকায় রয়েছে বিমান কর্মকর্তা মিজানুর রহমান শিশির, সহযোগী কৃষ্ণ সুধা, জিন্দাবাজারের ‘ইউরো বাংলা ট্রাভেলস’-এর মালিক শিপন আহমেদসহ আরও অনেকে। তারা ভুয়া ভিসা ও প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ।

এছাড়া লিবিয়া-ইতালি রুটে ‘গেম ঘর’ পরিচালনার অভিযোগে মাওলানা আব্দুল আজিজ, জকিগঞ্জ সীমান্তের লুৎফুর রহমান ও জহিরুল ইসলাম, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের আবুল হোসেন এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের জয়নাল আবেদিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দালাল ও সমন্বয়কারীর নাম উঠে এসেছে।

পাচারের ভয়াবহতা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। ২০২৪ সালে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে গোলাপগঞ্জের দুই তরুণের মৃত্যু হয়। এছাড়া অনেকেই বিদেশে গিয়ে জিম্মি হয়ে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়েছেন।

বর্তমানে সিলেট বিভাগীয় মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ৪৫০টিরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে সাক্ষীর অভাবে দোষীদের শাস্তির হার ১ শতাংশেরও নিচে।

সাম্প্রতিক ঈদ ছুটিতে মাত্র ৯ দিনে সিলেট সীমান্তে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট সীমান্তে সক্রিয় চক্রগুলো নারীদের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচার করছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, মানব পাচার থেকে অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দুবাই ও মালয়েশিয়ায় পাচার করা হচ্ছে। সিলেট নগরীর কিছু অনিবন্ধিত ট্রাভেল এজেন্সি এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।

এ বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, সিলেট একটি প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়ায় পাচারকারীরা সুযোগ নিচ্ছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের প্রভাব ও স্থানীয় দালাল চক্র ভেঙে না দিলে মানব পাচার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না।

সূত্র: যুগান্তর।