প্রকাশিত : ৩১ মার্চ, ২০২৬ ২০:৩৫ (বুধবার)
বাল্লা স্থলবন্দর: স্বপ্ন, বাস্তবতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

ছবি: বাল্লা স্থলবন্দর

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা স্থলবন্দর আজ উন্নয়নের এক ব্যর্থ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। প্রায় ৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বন্দরটি কার্যত অচল। ইয়ার্ড, ওয়্যারহাউজ, প্রশাসনিক ভবন- সবই প্রস্তুত, কিন্তু নেই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, নেই বাণিজ্যিক প্রাণচাঞ্চল্য। ফলে এটি এখন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও অব্যবহারের এক বোঝায় পরিণত হয়েছে।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল পরিকল্পনার ঘাটতি। শুরু থেকেই জানা ছিল যে সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরার পাহাড়মুড়ায় কোনো শুল্ক স্টেশন বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। অথচ সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলাফল- বাংলাদেশ অংশে বন্দর তৈরি হলেও আন্তঃদেশীয় সংযোগ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুই হয়নি। এটি শুধু অবকাঠামোগত নয়, কূটনৈতিক ও সমন্বয়গত ব্যর্থতারও উদাহরণ।

অন্যদিকে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। বন্দর চালু হলে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সীমান্ত অর্থনীতিতে গতি আসবে- এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উচ্ছেদ হওয়া শতাধিক পরিবার এখনো ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত, যা সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকার বেশি জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি নিয়ে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে জবাবদিহির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর মতো সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনার অভাব ছিল। এটি ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে সতর্কতা ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।

তবে সমস্যার সমাধান একেবারে অসম্ভব নয়। কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের সংশ্লিষ্ট অংশে শুল্ক স্টেশন ও অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বন্দরটি কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি বিকল্প ব্যবহার, যেমন লজিস্টিক হাব, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা আঞ্চলিক বাণিজ্য সহায়ক অবকাঠামো হিসেবেও এর পুনর্বিন্যাস বিবেচনা করা যেতে পারে।

সবশেষে, বাল্লা স্থলবন্দর আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। উন্নয়ন প্রকল্প কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং বাস্তবতা, আন্তঃদেশীয় সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বিবেচনায় পরিকল্পনা করা জরুরি। নইলে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পও পরিণত হতে পারে নিঃসঙ্গ অবকাঠামোতে- যার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম: ‘এই উন্নয়ন আসলে কার জন্য ছিল?’