ছবি: মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং উপদেষ্টা মাহাদি আমিন।
বাংলাদেশ থেকে সাধারণ কর্মী নিয়োগ পুনরায় চালুর লক্ষ্যে আলোচনার জন্য মালয়েশিয়ার মন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা শিগগিরই মালয়েশিয়া সফর করবেন। এ সফরকে ঘিরে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং দেশে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, প্রায় দুই বছর ধরে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে সাধারণ কর্মী নিয়োগ বন্ধ রেখেছে। তবে একই সময়ে নেপালসহ অন্যান্য উৎস দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় নতুন করে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা, নানা শর্ত ও জটিলতার কারণে এ বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদি আমিনের এ গুরুত্বপূর্ণ সফর আগামী ৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, সফরকে কেন্দ্র করে দেশে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একটি ফোরাম জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করে অতীতের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে এবং নতুন করে সিন্ডিকেট গঠনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এর আগে আরেকটি সংগঠন বিএমইটি ঘেরাও করে একই দাবি তোলে।
জানা যায়, অতীতে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশের বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ে ১০টি শর্ত আরোপ করলে তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানের এজেন্সিগুলো এসব শর্ত মেনে নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানায়। তবে পরবর্তীতে তৎকালীন সরকার মালয়েশিয়ার শর্ত অনুযায়ী এজেন্সির তালিকা প্রেরণ করে। ঠিক কতটি এবং কোন কোন এজেন্সি সেই তালিকায় ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়- ফলে সিন্ডিকেট পুনরায় সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থেকেই গেছে।
২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে মালয়েশিয়া সরকার। এতে অনেক কর্মী নির্ধারিত সময়ে যেতে না পারায় ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা দেয়। পরে তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, না যেতে পারা কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ প্রেক্ষিতে রিক্রুটিং এজেন্টরা সরকার নির্ধারিত ৭৯ হাজার টাকা ফেরত দিলেও অনেক কর্মী অভিযোগ করেছেন, তারা মোট ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা ব্যয় করলেও বাকি অর্থ ফেরত পাননি।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় শতাধিক কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এ সংক্রান্ত একাধিক মামলা বর্তমানে পুলিশ, সিআইডি, দুদক ও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতারণামূলক আর্থিক লেনদেন, মানবপাচার ও অর্থপাচারের ঘটনায় মালয়েশিয়ার নাম জড়ানোয় দেশটি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে। আইনজ্ঞদের মতে, চলমান এসব মামলা নতুন করে কর্মী প্রেরণ ও গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩ সালে এই কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়। তবে মালয়েশিয়া সরকার দাবি করেছে, তাদের দেশে এ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম ঘটেনি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, প্রবাসীবান্ধব নীতির মাধ্যমে নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং শূন্য বা ন্যূনতম খরচে বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ৫ বছরে ১ কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকারও এ আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ পুনরায় চালু করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে মালয়েশিয়া সরকারের আমন্ত্রণকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন রিক্রুটিং এজেন্সি ও কর্মপ্রত্যাশীরা।
তারা আশা করছেন, সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং ভবিষ্যতে হঠাৎ করে শ্রমবাজার বন্ধ না হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।
অভিবাসন বিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত সরকারের সময়ে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। তাই বর্তমান সরকারকে সতর্ক থেকে কার্যকর সমাধান দিতে হবে। বারবার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়া, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও নীতিগত জটিলতা বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।
তিনি আরও বলেন, “আসন্ন মন্ত্রী-উপদেষ্টার সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সফল হলে শুধু শ্রমবাজার পুনরায় চালু হবে না, বরং একটি স্বচ্ছ ও টেকসই কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হবে এবং দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে।