ছবি: সংগৃহীত
কিছুদিন আগেও বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য ছিল কানাডা। তবে কঠোর ভিসানীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে দেশটিতে পড়তে যাওয়ার আগ্রহ দ্রুত কমে যাচ্ছে।
ভারতের একটি শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শোভিত আনন্দ জানান, ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ আবেদনই ছিল কানাডার জন্য। কিন্তু বর্তমানে সেই আবেদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে।
কানাডার অডিটর জেনারেলের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশটিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারতীয়দের হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ সালের শুরুতে কানাডা সরকার দুই বছরের জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তির সংখ্যা সীমিত করে। স্নাতক ও ডিপ্লোমা পর্যায়ে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার স্টাডি পারমিট নির্ধারণ করা হয়, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ওপর।
এছাড়া দেশটিতে বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক গ্যারান্টিড ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেট (জিআইসি) ১০ হাজার কানাডিয়ান ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলারের বেশি করা হয়েছে, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীবিষয়ক সংস্থা আইসিইএফ মনিটর-এর তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় স্টাডি পারমিট প্রত্যাখ্যানের হার ২০২৩ সালে ছিল ৩৮ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৫২ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে বিদেশে পড়াশোনার পরিকল্পনায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
কানাডার চাকরির বাজারেও সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক বেসরকারি কলেজ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করে দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং স্নাতকদের জন্য পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ তৈরি হয়নি।
দিল্লির পরামর্শক শোভিত আনন্দ জানান, তার এক সাবেক শিক্ষার্থী দুই বছর আগে কানাডায় গেলেও কোর্স শেষ করে স্থায়ী চাকরি না পেয়ে খণ্ডকালীন কাজ করে জীবনযাপন করছিলেন। পরে তিনি ভারতে ফিরে আসেন।
এদিকে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কানাডা এখন আর নিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক নয়। ১৭ বছর বয়সী তানিশক খুরানা বলেন, ভিসা প্রত্যাখ্যান ও সীমিত ভর্তিনীতির কারণে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা ভাবছিলেন। তবে পারিবারিক কারণে শেষ পর্যন্ত আবারও কানাডায় আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, একসময় কানাডার স্টাডি পারমিট মানেই ছিল চাকরি, স্থায়ী বসবাস এবং উন্নত জীবনের সুযোগ। কিন্তু এখন সেই নিশ্চয়তা কমে গেছে। ফলে অনেক ভারতীয় শিক্ষার্থীর কাছে কানাডা আর নিশ্চিত পরিকল্পনা নয়, বরং এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ‘বাজি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।