একসাথে এতগুলো সংকট, এমন সময়ে, এমন চাপ- সিলেট যেন হঠাৎ করেই এক অদৃশ্য ঘূর্ণির মধ্যে আটকে গেছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা আর কাঠামোগত দুর্বলতার উপর ভর করে নতুন নতুন সমস্যাগুলো এমনভাবে আঘাত হানছে, যেন একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িয়ে পুরো জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। বিদ্যুৎ নেই, জ্বালানি নেই, বাজারে আগুন, হাসপাতালে শিশুদের ভিড়, এখন আবার বৃষ্টি-বন্যা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি সব মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নগরবাসী।
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি করেছে বিদ্যুৎ সংকট। গত কয়েকদিন ধরে শহর থেকে গ্রাম সবখানেই লোডশেডিং যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। কোথাও মোমবাতি, কোথাও পুরনো চার্জার লাইট- এগুলোই এখন ভরসা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- সিলেটে বিদ্যুৎ যায় না, মাঝে মাঝে আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিলেটে যেখানে চাহিদা প্রায় ৪৭৭ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াটের মতো। এই বড় ঘাটতির মূল কারণ হিসেবে গ্যাস সংকটকে দায়ী করা হচ্ছে, যার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। শহরে দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, আর অনেক গ্রামে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে মানুষকে। এর মধ্যে আবার রক্ষণাবেক্ষণের নামে নির্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় ভোগান্তি আরও বাড়ছে। বিদ্যুতের এই সংকট সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলেছে এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং ব্যবসায়ীদের।
এই সংকটের মাঝেই নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে হাম। শনিবার একসাথে ৩ শিশুর মৃত্যুর পর আজ রোববার আরেক শিশুর প্রাণ গেলো। এ নিয়ে গত ১৯ দিনে ১০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পুরো অঞ্চলে উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। যদিও সব ক্ষেত্রে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে উপসর্গ ও পরিস্থিতি আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। একদিনেই তিন শিশুর মৃত্যু, তাদের বয়স মাত্র ৫ থেকে ১০ মাস- এই তথ্য অভিভাবকদের মনে ভয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, চিকিৎসকরা বলছেন অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও সংক্রমণের এই ধারা থামাতে কতটা সময় লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
এরই মধ্যে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আরেক বড় শঙ্কা- অতিবৃষ্টি ও বন্যা। আবহাওয়া বিশ্লেষণ বলছে, আজ রোববার (২৬ এপ্রিল) শুরু হয়ে ৭ মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিশালী বৃষ্টি বলয় “ঝুমুল” অবস্থান করতে পারে। শক্তিশালী এই বৃষ্টি বলয়ের প্রভাবে সিলেট অঞ্চলে টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামার সম্ভাবনা থাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের মানুষের নির্ঘুম রাত কাটবে বন্যার শংকায়, আর উচু স্থানে আছে পাহাড় ধ্বসের ভয়। প্রতিবছরই এই সময়টাতে সিলেটে পাহাড়ধ্বসে প্রাণহানীর খবর মিলে। কখনো কখনো ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যায় গোটা পরিবার। আর নগরের ভেতরে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার পুরনো সমস্যা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। হাওরাঞ্চলে ধান কাটার মৌসুম চলায় কৃষকরাও বড় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন- সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে না পারলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
সবশেষে, এই সব সংকটের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে এসেছে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। পণ্যমূল্য যেনো লাগাম ছিড়েছে। বাজারে কিছু সবজির দাম কমলেও মাছ ও মাংসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রায় সব পণ্যের দামেই প্রভাব পড়েছে। ডিম, চাল, চিনি, পেঁয়াজ- সবকিছুতেই বাড়তি চাপ অনুভব করছেন ক্রেতারা। সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য এই পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে টিকে থাকার লড়াইয়ের মতো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাসভাড়া বৃদ্ধি, যা সামনের দিনগুলোতে যাতায়াত খরচও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের মুল্যবৃদ্ধির ফলে আজ থেকে ঢাকা-সিলেটসহ সকল রুটে বাড়তি ভাড়া গুণতে হবে বাস যাত্রীদের।
তাছাড়া রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। সাম্প্রতিক সময়ে নগরজুড়ে চুরি-ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার সাথে নতুন আরেক দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। একটি জঙ্গি সংগঠন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে পারে এমন আশঙ্কা পুলিশের। এজন্য সারাদেশের পাশাপাশি সিলেট নগরীতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
সব মিলিয়ে সিলেট এখন একসাথে চারটি বড় সংকটের মুখোমুখি- বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা এবং লাগামছাড়া বাজারদর। এর প্রতিটি এককভাবেই বড় সমস্যা, কিন্তু একসাথে এসে এগুলো জনজীবনে তৈরি করছে বহুমাত্রিক চাপ। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এই চাপ কতদিন চলবে, আর এর থেকে বের হওয়ার পথ কোথায়?