ছবি: সংগৃহীত
হবিগঞ্জ জেলায় চলমান কালবৈশাখীর তাণ্ডবে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন ৪–৫ দফা বজ্রপাত, দমকা হাওয়া, প্রবল ঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত ও শিলাবৃষ্টি আঘাত হানছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়। এতে একদিকে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে, অন্যদিকে ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) কালবৈশাখীর তাণ্ডবে জেলায় অন্তত ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নবীগঞ্জ উপজেলায় বজ্রপাতে মকসুদ মিয়া (৩৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। বিকেলে উপজেলার পানিউমদা ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। তিনি ওই গ্রামের মৃত ছাবর উল্লাহর ছেলে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিকেলে বাড়ির পাশের নোয়াগাঁও গড়দার হাওরের মাঠ থেকে গরু আনতে গেলে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় বজ্রপাতের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোনায়েম মিয়া।
এদিকে বানিয়াচং উপজেলার চাকনিয়া হাওড়ে বজ্রপাত থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আব্দুস ছালাম (৬০) নামে এক ধানকাটা শ্রমিক মারা যান। তিনি জাতুকর্ণ পাড়া মহল্লার বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে মাঠে কাজ করা শ্রমিকরা নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি যাত্রী ছাউনিতে আশ্রয় নিতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে একই দিনে চুনারুঘাট–বাল্লা সড়কের জারুলিয়া এলাকায় ঝড়ের কবলে পড়ে সিএনজি চালক ছনখলা গ্রামের ছায়েদ আলীর মৃত্যু হয়েছে।
কালবৈশাখীর এই তাণ্ডবে হবিগঞ্জের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে উঠেছে। দমকা হাওয়ায় গাছপালা উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়ায় বারবার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাও বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি দেখা দিয়েছে। হাওরাঞ্চলে পাকা ধান পানিতে নুয়ে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের বছরের প্রধান ফসল হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাদ্যসংকটের আশঙ্কায় রয়েছে।
ঝড়-বৃষ্টির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি কমে গেছে। শিক্ষার্থীরা যাতায়াতে সমস্যায় পড়ছে, ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। রাস্তাঘাট কাদা-পানিতে ভরে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষিশ্রমিকদের জন্য। তারা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে হবিগঞ্জ জেলার জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।