প্রকাশিত : ০২ মে, ২০২৬ ১২:৩৮ (শনিবার)
বিরোধী রাজনীতির মাশুল, আরিফুল হকের অপেক্ষার অবসান!

সিলেট নগর ভবনের দুপুরটা ছিল আনুষ্ঠানিকতা আর প্রত্যাশার মিশেলে ভরা। চারপাশে উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘোষণা, নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদের কথা। কিন্তু এই আয়োজনের মাঝেও এক ধরনের বিষণ্নতার সুর শোনা গেল সাবেক মেয়র ও বর্তমান শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর কণ্ঠে।


তিনি যেন শুধু একটি প্রকল্পের কথা বলেননি, বলেছেন এক দশকের অপেক্ষা, না-পাওয়া আর রাজনৈতিক বাস্তবতার গল্প।


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে সুধী সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী স্মরণ করলেন নিজের মেয়র থাকার সময়কার অভিজ্ঞতা। তাঁর ভাষায়, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে যেসব প্রকল্প আজ উদ্বোধনের পর্যায়ে এসেছে, সেগুলোর বীজ বপন হয়েছিল তাঁর মেয়াদকালেই। পরিকল্পনা ছিল, নকশা ছিল, প্রয়োজনীয়তা ছিল; কেবল ছিল না অনুমোদনের সবুজ সংকেত।


তার অভিযোগ, বিএনপির রাজনীতি করার কারণেই তিনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টানা ১০ বছর মেয়র থাকলেও একটি বড় প্রকল্পও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। যেন দায়িত্ব ছিল, কিন্তু ক্ষমতা ছিল সীমিত; স্বপ্ন ছিল, কিন্তু তার বাস্তবায়নের পথ আটকে ছিল রাজনৈতিক দেয়ালে।


একজন নগর প্রশাসকের জন্য এর চেয়ে বড় হতাশা আর কী হতে পারে; যখন শহরের মানুষ প্রতিদিন জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ পোহায়, আর নিজের টেবিলে পড়ে থাকা প্রকল্প ফাইলগুলো শুধু অপেক্ষার সাক্ষী হয়ে থাকে।


আরিফুল হক চৌধুরী উল্লেখ করেন, সিলেটের বহুল আলোচিত ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েও থেমে যায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। উন্নয়নের সম্ভাবনাগুলো যেন একে একে থেমে গেছে প্রশাসনিক জটিলতা আর রাজনৈতিক বিবেচনার কাছে।


তার কথায় উঠে আসে লাক্কাতুরা থেকে ছড়া খনন করে সুরমা নদী পর্যন্ত সংযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথাও। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নগরের অন্তত ৫০টি এলাকা জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। দীর্ঘদিনের এই ভাবনাটি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার উদ্যোগ নিলে সেটি নগরবাসীর জন্য বড় স্বস্তি হয়ে আসতে পারে।


সিলেটের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকে স্বাগত জানিয়ে তিনি আবারও বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। বিদেশি অর্থায়নের অপেক্ষায় থাকলে এমন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও এক দশক লেগে যেতে পারে; তাই সরকারি অর্থায়নেই কাজটি দ্রুত শুরু করার আহ্বান জানান তিনি।


নগরের সম্প্রসারিত অংশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক এই মেয়র। তাঁর মতে, শহর বড় হয়েছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। ফলে নতুন এলাকাগুলো এখনো অবকাঠামোগতভাবে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।


একজন রাজনীতিকের বক্তব্যে অভিযোগ থাকতেই পারে, রাজনৈতিক বার্তাও থাকতে পারে। তবে আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছে এক ধরনের আক্ষেপ; যেন সময়মতো সিদ্ধান্ত হলে সিলেটের অনেক সমস্যার সমাধান আরও আগেই হতে পারত।


উন্নয়নের রাজনীতি যখন প্রায়ই দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়, তখন ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে শহর, নাগরিক আর সময়। আর সেই সময়ের ভার বয়ে বেড়ায় কিছু অসমাপ্ত প্রকল্প, কিছু অপেক্ষমাণ ফাইল, আর কিছু মানুষের অপূর্ণ প্রত্যাশা।