প্রকাশিত : ২০ মে, ২০২৬ ২০:৪২ (বৃহস্পতিবার)
হাওরে ফসলহানির প্রভাব বাজারে, বাড়তে শুরু করেছে চালের দাম

ছবি: সংগৃহীত

হাওর অঞ্চলে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ধানের ক্ষতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চালের বাজারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে, এবার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন চাল, যা বোরো মৌসুমের মোট উৎপাদনের প্রায় ১ শতাংশ। তবে এরই মধ্যে পাইকারি বাজারে চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

রাজধানীর বাবুবাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও কারওয়ান বাজার ঘুরে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত তিন-চার দিনে মোটা, মাঝারি ও সরু- সব ধরনের চালের দামই বেড়েছে। যদিও এখনো খুচরা বাজারে এর বড় প্রভাব পড়েনি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বোরো মৌসুমে সাধারণত চালের দাম কমে। এবারও মৌসুমের শুরুতে দাম কিছুটা কমছিল। কিন্তু সেই ধারা স্থায়ী হয়নি। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ফসলহানির খবর বাজারে আসতেই আবার দাম বাড়তে শুরু করেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত টানা ৯ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওর অঞ্চলের ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত সাত জেলা হলো- সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে।

হাওর অঞ্চলে এবার মোট ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মোট আবাদি জমির প্রায় ১১ শতাংশ।

ডিএই’র সরেজমিন শাখার অতিরিক্ত পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, গত দুই বছর এ ধরনের আগাম বৃষ্টি বা বন্যা হয়নি। এবার পানি নামতে দেরি হওয়ায় ধান রোপণও দেরিতে হয়েছে। এর মধ্যেই আগাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল এসে কৃষকের ক্ষতি বাড়িয়েছে।

তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকার জনপ্রতি সাড়ে সাত হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এতে মোট প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুন আখতার জানিয়েছেন, মে, জুন ও জুলাই- এই তিন মাস আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি চলবে।

এদিকে বাজারে চালের দাম বাড়তে শুরু করায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বরিশাল রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন রেজা বলেন, “বোরো মৌসুমে চালের দাম কমার কথা। এবারও কমছিল, কিন্তু এখন আবার বাড়ছে।”

পুরান ঢাকার বাবুবাজারের ব্যবসায়ী কাওসার রহমান জানান, সপ্তাহখানেক আগেও নতুন সরু চাল পুরোনো চালের তুলনায় কেজিতে ১০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছিল। এখন আবার সব ধরনের চালের দাম ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বর্তমানে বাবুবাজারে নতুন মোটা চাল ৪৫-৪৬ টাকা, পাইজাম ও বিআর-২৮ চাল ৫১-৫২ টাকা, মিনিকেট ৬০-৬৬ টাকা এবং নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, খুচরা বাজারে মোটা চালের কেজি ৪৮ থেকে ৬০ টাকা, মাঝারি চাল ৫২ থেকে ৬৮ টাকা এবং সরু চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০১৭ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি না হলেও বাজারে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওই বছর আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ও আমনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তখন মোটা চালের দাম কেজিতে ৪৮ টাকায় ওঠে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ টাকা বেশি ছিল।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর বলেন, `চালের দাম বাড়ছে, কিন্তু কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। সামনে মিলমালিকদের সিন্ডিকেট তৈরির ঝুঁকিও আছে।'

তিনি আরও বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের চালের মজুত বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে সরকারি মজুত রয়েছে প্রায় ১২ লাখ ৬১ হাজার টন। এটি কোনো অবস্থাতেই ১২ লাখ ৫০ হাজার টনের নিচে নামতে দেওয়া যাবে না বলে মত দেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে চালের দাম আরও বাড়লে নিম্নআয় ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। তাই বাজারে নজরদারি বাড়ানো এবং প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট শুল্কে চাল আমদানি উন্মুক্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।