ছবি: সংগৃহীত
‘বড় একটি এক্সিডেন্ট হোক, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হোক দেহ, স্বপ্নগুলো মরে যাক, মুছে যাক সব অপূর্ণতা’; ফেসবুকে লেখা কয়েকটি বাক্য। হয়তো মুহূর্তের আবেগ, হয়তো দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্লান্তি, হয়তো নিঃশব্দ আর্তনাদ। কিন্তু কে জানত, এই শব্দগুলোই কয়েক ঘণ্টা পর হয়ে উঠবে এক তরুণ প্রবাসীর জীবনের শেষ ভাষ্য।
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের ছেলে মাহাদি রাজ শুভ। বয়স খুব বেশি নয়। জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্নে আবারও পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। বিদেশ বিভুঁইয়ে মানুষের জীবন কেবল রোজগারের নয়, সেখানে লুকিয়ে থাকে একাকিত্ব, চাপা কষ্ট, অনিদ্রার রাত আর পরিবারকে ভালো রাখার অবিরাম যুদ্ধ। মাহাদিও হয়তো সেই যুদ্ধেরই একজন ক্লান্ত সৈনিক ছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার ভোরে প্রতিদিনের মতো ফুড ডেলিভারির কাজে বের হয়েছিলেন তিনি। সূর্য ডুবল, রাত বাড়ল, কিন্তু আর ফেরেননি বাসায়। সহকর্মীরা ফোন করলেন বারবার। ফোন বন্ধ। অজানা এক আশঙ্কা ধীরে ধীরে ঘিরে ধরল সবাইকে। তারপর গভীর রাতে সৌদি পুলিশের ফোন-রিয়াদের তোমামা এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে মাহাদির।
বর্তমানে তার মরদেহ পড়ে আছে কিং সৌদি হাসপাতালের মর্গে। অথচ হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশের বাড়িতে এখনো জানেন না তার মা। জানেন না তার বোন। পরিবারের অনুরোধ; এখনই যেন তাদের না জানানো হয়। হয়তো তারা একটু সময় নিতে চায়। কারণ, এমন সংবাদ মানুষকে মুহূর্তেই ভেঙে দেয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাহাদি কয়েক দিন ধরেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। জীবনের হিসাবগুলো যেন বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। সৌদিতে অনেক টাকা খরচ করে বাবা তার জন্য একটি দোকান কিনে দিয়েছিলেন। পরে সেটি বিক্রি হয়ে যায়। পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলেন, পরে পরিবার তা মেনে নেয়। তিন বছরের ছোট্ট একটি সন্তানও আছে তার। কিন্তু দায়িত্ব, বাস্তবতা আর স্বপ্নের ভারে হয়তো ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত। বাইরে থেকে যার হাসিমুখ দেখা যায়, তার ভেতরে হয়তো ঝড় বয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই কিছু স্ট্যাটাস দেখি, কিছু বিষণ্ন শব্দ পড়ি; কিন্তু সেসবের গভীরে কতটা কষ্ট জমে আছে, তা কি আমরা বুঝতে পারি?
মাহাদির শেষ স্ট্যাটাসটি এখন সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে। কেউ বলছেন এটি ছিল হতাশা, কেউ বলছেন ভবিষ্যতের অশনিসংকেত। কিন্তু সত্যি হলো; একজন মানুষ খুব নীরবে সাহায্য চাইছিলেন হয়তো। আর আমরা বুঝে উঠতে পারিনি।
প্রবাস মানে শুধু অর্থ উপার্জন নয়। প্রবাস মানে প্রতিদিন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করা। পরিবারকে সুখে রাখার জন্য নিজের কষ্ট গোপন করা। দিনের শেষে একা ঘরে ফিরে বুকভরা শূন্যতা নিয়ে বেঁচে থাকা। অনেক প্রবাসীর জীবনেই থাকে না কাউকে খুলে বলার মানুষ।
আজ মাহাদি নেই। পড়ে আছে তার অপূর্ণ স্বপ্ন, ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যৎ, আর একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। ফেসবুকের সেই স্ট্যাটাস এখন শুধু কিছু শব্দ নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক নিঃশব্দ মানুষের ভাঙা হৃদয়ের দলিল।
হয়তো মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো তিনি বলতে চেয়েছিলেন; তিনি ভালো নেই।