ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার পরও দ্রুত নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করছে ইরান। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া একাধিক ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ইতোমধ্যে আবার সচল করা হয়েছে, যার ফলে ইসরায়েল ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা অনেকটাই ফিরে পেয়েছে তেহরান।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার মোট ৬৯টি প্রবেশপথে হামলা চালিয়েছিল। তবে এর মধ্যে অন্তত ৫০টি প্রবেশপথ ইতোমধ্যে পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছে ইরান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে যে শুধুমাত্র টানেলের মুখ বা প্রবেশপথ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর প্রবেশপথ, সংযোগ সড়ক এবং সহায়ক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু সিএনএনের পর্যালোচনা করা সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইরান বুলডোজার, ফ্রন্ট-এন্ড লোডার ও ডাম্প ট্রাকের মতো সাধারণ নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করে দ্রুত ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও প্রবেশপথ পুনর্নির্মাণ করছে।
যেসব সড়কে বোমা ফেলে বড় বড় গর্ত তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশই ভরাট করা হয়েছে। কিছু এলাকায় নতুন করে কংক্রিট ঢালাইও করা হয়েছে।
ইস্পাহানের বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে চারটি টানেল বন্ধ করতে একাধিক হামলা চালানো হয়েছিল। সেখানে অন্তত ১৮টি বড় গর্ত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গর্তগুলো ভরাট করে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
খোমেইনের কাছের আরেকটি ঘাঁটির স্যাটেলাইট ছবিতে অন্তত ১০টি নির্মাণযানকে প্রবেশপথ পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজে নিয়োজিত দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার মনে করেন, ইরানের হাতে এখনও বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে।
তার ভাষায়, “যতদিন উৎক্ষেপণযন্ত্র ও প্রশিক্ষিত ক্রু থাকবে, ততদিন ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে পারবে। উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও তাদের অভিযান থেমে যাবে না।”
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডারগুলোতে এখনও প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে। প্রবেশপথে হামলা হলেও মাটির অনেক গভীরে সংরক্ষিত এসব ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ অক্ষত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
প্রায় সাত সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পুনর্গঠন কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে ইরান। যুদ্ধ চলাকালেও ঝুঁকি নিয়ে টানেলগুলো পুনরায় সচল রাখার চেষ্টা করেছে দেশটি, যার ফলে পুরো সংঘাতকালেই তারা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি নয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। রকেট জ্বালানি, ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মূল কাঠামো তৈরির বিভিন্ন কারখানায় হামলা চালানো হয়।
যুদ্ধবিরতির পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরানের অবশিষ্ট উৎক্ষেপণযন্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা নেই এবং তাদের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান ইতোমধ্যে ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে।
জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক তাইমুর কাদিশেভ বলেন, ইরান দুই দশকের বেশি সময় ধরে এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে।
তার মতে, “এ ধরনের ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করতে অত্যন্ত উন্নত ও ব্যয়বহুল অস্ত্র প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেগুলো পুনরুদ্ধারে অনেক সময় কয়েকটি বুলডোজারই যথেষ্ট।”
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম প্রমাণ করছে যে ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক এখনও দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি। ফলে ভবিষ্যতে সংঘাত পুনরায় শুরু হলে তেহরান দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে।