প্রকাশিত : ০৪ জুন, ২০২৬ ১১:৩৩ (শুক্রবার)
২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব ফুটবলে শীর্ষ পৌঁছাতে চায় চীন

ছবি: সংগৃহীত

উত্তর আমেরিকায় ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখনও দর্শকের ভূমিকাতেই থাকতে হচ্ছে চীনকে। তবে দেশটির ফুটবল অঙ্গনে নতুন এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ডেলিভারি কর্মী থেকে শুরু করে গ্রামের তরুণদের নিয়ে গঠিত অপেশাদার দলগুলো এখন দর্শকভর্তি স্টেডিয়ামে খেলছে, যা অনেকের মতে চীনে ফুটবল সংস্কৃতির ধীরে ধীরে বিকাশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের জন্য বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া বহুদিনের জাতীয় লক্ষ্য। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একসময় ফুটবল নিয়ে তিনটি স্বপ্নের কথা বলেছিলেন—বিশ্বকাপ আয়োজন, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ এবং একদিন বিশ্বকাপ জয়।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০১৬ সালে চীনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করে। পরিকল্পনায় ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব ফুটবলে শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর অংশ হিসেবে ২০২০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে ৭০ হাজার ফুটবল মাঠ নির্মাণ এবং তিন কোটি স্কুলশিক্ষার্থীকে ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল।

তবে এক দশক পর সেই পরিকল্পনার ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী আসেনি। ২০১৬ সালে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ৮২তম স্থানে থাকা চীন বর্তমানে ৯৪তম অবস্থানে নেমে গেছে। এমনকি বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮-এ বাড়ানোর পরও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি দেশটি। ২০২৫ সালের জুনে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন আবারও ভেঙে যায়।

এ পর্যন্ত ২০০২ সালের বিশ্বকাপই চীনের একমাত্র অংশগ্রহণ। সেবার তারা কোনো গোল করতে না পেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনে ফুটবলকে জনপ্রিয় করে তোলার প্রচেষ্টা কেবল খেলাধুলার বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থও।

২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর শি জিনপিং ‘চায়নিজ ড্রিম’ বা ‘চীনা স্বপ্ন’-এর ধারণা সামনে আনেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় পুনর্জাগরণ। পরবর্তীতে ফুটবলকেও সেই বৃহত্তর জাতীয় স্বপ্নের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এরপর চীনা সুপার লিগে বিদেশি তারকা খেলোয়াড় আনার হিড়িক পড়ে যায়। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ক্লাবগুলো খেলোয়াড় কেনাবেচায় প্রায় ১ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। ব্রাজিলের অস্কার, পাওলিনিয়ো, কার্লোস তেভেজ এবং হাল্কের মতো পরিচিত তারকারা ইউরোপ ছেড়ে চীনে পাড়ি জমান।

এই বিপুল বিনিয়োগের পেছনে ছিল মূলত রিয়েল এস্টেট খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠান। ২০১৮ সালের মধ্যে চীনা শীর্ষ লিগের সবগুলো ক্লাবের মালিকানার সঙ্গে আবাসন ব্যবসার সম্পর্ক ছিল।

ফুটবল গবেষক ড. টোবিয়াস রসের মতে, এসব বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য ছিল না ফুটবলের উন্নয়ন; বরং স্থানীয় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা। চীনা সংস্কৃতির ‘গুয়ানসি’ ও ‘রেনছিং’ নামে পরিচিত পারস্পরিক সুবিধা ও সম্পর্কভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা জমি ও ব্যাংক ঋণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা লাভ করতেন, আর স্থানীয় কর্মকর্তারা পেতেন মর্যাদা ও রাজনৈতিক সুবিধা।

এই সম্পর্কের ফলেই ব্যয়বহুল খেলোয়াড় কেনা এবং দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রবণতা বাড়ে। কাগজে-কলমে এসব প্রকল্প আকর্ষণীয় দেখালেও অর্থনৈতিকভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লাভজনক ছিল না।

এর অন্যতম উদাহরণ চীনের সফলতম ক্লাব গুয়াংজু এভারগ্র্যান্ড। এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের দুইবারের শিরোপাজয়ী এবং চীনা সুপার লিগের আটবারের চ্যাম্পিয়ন ক্লাবটি বছরে ১৫৫ থেকে ৩১০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত লোকসান গুনছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে ফুটবলে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেও চীন এখনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নতুন আশার সঞ্চার করছে। অনেকের বিশ্বাস, দীর্ঘমেয়াদে এই ভিত্তিই চীনের ফুটবলকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পারে।