ছবি: সংগৃহীত
আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে-‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা: জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’। এই প্রতিপাদ্যে প্রকৃতিকে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ উপলক্ষে সিলেটেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, র্যালি, আলোচনা সভা ও সচেতনতামূলক বিভিন্ন আয়োজন হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে দিবসটি ঘিরে আনুষ্ঠানিক আয়োজন থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন সিলেটের অনেক পরিবেশ সচেতন নাগরিক।
তাদের মতে, নগরীতে প্রতিনিয়ত শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও পানি দূষণ বাড়ছে। সুরমা নদীসহ আশপাশের বিভিন্ন জলাশয়ে সরাসরি পয়ঃবর্জ্য ও নোংরা পানি গিয়ে মিশছে, ফলে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে জলজ প্রাণী ও মাছের প্রজনন হ্রাস পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দূষিত পানির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রোগব্যাধিও বাড়ছে।
অন্যদিকে নগরীতে যানবাহনের ধোঁয়া এবং অপরিকল্পিত ইটভাটার কারণে বায়ুদূষণের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। তবে এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে নগরীর সবুজায়ন হ্রাস পাওয়া। একসময় যে সিলেটকে সবুজের শহর হিসেবে পরিচিত বলা হতো, সেই নগরী এখন ধীরে ধীরে কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে। উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছপালা কাটা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের ফলে নগরীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তাদের মতে, কেবল ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামোগত উন্নয়নকে প্রকৃত উন্নয়ন হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিবেশ সংকটকে আরও তীব্র করছে। অথচ টেকসই নগর উন্নয়নের জন্য সবুজায়ন, জলাশয় সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা অপরিহার্য।
পরিবেশ দিবসকে ঘিরে আলোচনা, সভা, সেমিনার ও র্যালির আয়োজন থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হচ্ছে; তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, পরিবেশ রক্ষায় শুধু দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসম্পৃক্ত কার্যকর উদ্যোগ।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও পরিবেশকর্মী অ্যাডভোকেট সুদীপ্ত অর্জুন বলেন, ‘দিঘির আধিক্যের জন্য সিলেটকে বলা হতো দিঘির শহর। ধোপাদিঘি, সাগরদিঘি, লালদিঘি, বেকাদিঘি, রামেরদিঘি, কাজীদিঘি, মাছুদিঘি সহ আরো অনেক দিঘি ছিল নগরীতে, যাদের নামেই পরিচিত সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো। ছিল ছোট ছোট জলাধার, আমরা স্থানীয়ভাবে যেগুলোকে জল্লা বলি। আমাদের পরিকল্পনাহীনতা আর সীমাহীন লোভে আজ সেগুলো আবাসন, মার্কেট বা ভরাট জমি। সেই সাথে যোগ হয়েছে নির্বিচার টিলা কাটা, বনাঞ্চল ধ্বংস। টিলার শহরে আজ টিলা চোখে পড়ে না। অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও ড্রেনেজ নির্মাণ তো আছেই। এসব বললে অনেকেই আবার "উন্নয়নের শত্রু" ট্যাগ দেন। সব মিলিয়ে সিলেট আজ তার অতুলনীয় সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য হারাতে বসেছে। রয়েছে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা। ভবিষ্যৎ রক্ষায় তাই প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ, গণদাবী আর পরিবেশ রক্ষার গণ অঙ্গীকার।’
নগরীর নয়াসড়কের পোশাক ব্যবসায়ী তাহমিদুল হাসান জাভেদ ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘এই নগরীতেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ছোটবেলায় যে সবুজ গাছপালা আর প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখেছি, তার অনেকটাই আজ হারিয়ে গেছে। মাত্র ১৫ বছর আগেও সিলেটের আবহাওয়া এতটা উষ্ণ ছিল না। গ্রীষ্মকালজুড়ে প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টিপাত হতো, প্রকৃতিও ছিল অনেক বেশি সতেজ ও প্রাণবন্ত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। নগরীতে গাছপালার সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে, বাড়ছে কংক্রিটের বিস্তার। এর প্রভাব পড়ছে জলবায়ুর ওপরও; তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে, আর নগরজীবন হয়ে উঠছে আরও কঠিন। দুঃখজনক হলেও সত্য, নগরীর সবুজায়ন ও বৃক্ষসংরক্ষণ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। এ বিষয়ে জনসচেতনতা যেমন কম, তেমনি উৎসাহ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারও অভাব রয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য একটি সিলেট গড়ে তুলতে হলে এখনই নগরীর সবুজ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
দক্ষিণসুরমার পেট্রোল পাম্প ব্যবসায়ী এনামূল হক রুবেল বলেন, ‘নিজেদের আশপাশের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের উদাসীনতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমরা প্রতিনিয়ত অপচনশীল পলিথিন ও প্লাস্টিকজাত পণ্য ব্যবহার করছি এবং ব্যবহারের পর সেগুলো যত্রতত্র ফেলে দিয়ে মাটি, পানি ও সামগ্রিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছি। অথচ এ বিষয়ে ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতার ঘাটতি এখনও প্রকট। পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের অভাব নেই; কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন কিংবা বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। শুধু কথায় নয়, পরিবেশ রক্ষায় এখন প্রয়োজন আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ এবং ধারাবাহিক বাস্তব পদক্ষেপ। কারণ সুস্থ ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।’
মেটলাইফ ইন্সুরেন্স সিলেটে কর্মরত রীতেন রায় ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘পরিবেশ নিয়ে কি আর বলবো? যে দেশের লোকজন নিজের লাভের জন্য খাবারে বিষ মিশায় সেখানে পরিবেশ সচেতনতা অলীক কল্পনা। পরিবেশ সচেতনতা শুধু বক্তৃতা বা প্রচারণার বিষয় নয়; এটি মানুষের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।’
রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাজিম অপু বলেন, ‘আমাদের জনপ্রতিনিধির অভাব নেই, কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ও দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাব চোখে পড়ে। পরিবেশ, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট ভাবনা ও কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দৃশ্যমান নয়। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেই উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। প্রকৃতি ধ্বংস করে কিংবা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে অর্জিত উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনমানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই পরিবেশ দূষণের উৎসগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সচেতন করার পাশাপাশি আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। যারা নিয়ম ভঙ্গ করে পরিবেশের ক্ষতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে অর্থদণ্ড বৃদ্ধি, জরিমানা আদায় এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, জনসচেতনতা এবং কার্যকর মনিটরিংয়ের সমন্বয়েই কেবল একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।’
এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন ফোরামের আহ্বায়ক লিয়াকত শাহ ফরিদী বলেন, ‘পরিবেশ দূষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ কিংবা বিশ্ব পরিবেশ দিবস-এসব বিষয় অনেক সময় করপোরেট পর্যায়, সেমিনার কিংবা আনুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অথচ পরিবেশ রক্ষার প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। আমরা ক্রমাগত প্রাকৃতিক পরিবেশ, বনভূমি, জলাভূমি ও উদ্যান ধ্বংস করে তার জায়গায় কৃত্রিম স্থাপনা নির্মাণ করছি। উন্নয়নের নামে এসব কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য ও বৈশিষ্ট্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, কমে যাচ্ছে সবুজের পরিমাণ, আর পরিবেশগত সংকট আরও গভীর হচ্ছে। প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে শুধু আলোচনা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ করে তুলতে হবে। প্রকৃতির স্বাভাবিক চরিত্র ও ভারসাম্য রক্ষা করেই উন্নয়নের পথ খুঁজে নেওয়া আজ সময়ের দাবি।’
গৃহিনী সুলতানা বেগম সুমি বলেন, ‘পরিবেশ বিষয়টি যেন এখন অনেকাংশেই সুশীল সমাজের আভিজাত্য প্রদর্শনের একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরীতে হাতেগোনা কয়েকজন পরিবেশকর্মী রয়েছেন, যাদের নিয়েই মূলত আলোচনা ঘুরে ফিরে আসে। মিডিয়াও অনেক ক্ষেত্রে তাদের কর্মকাণ্ডকেই কেন্দ্র করে পরিবেশ বিষয়ক সংবাদ বা আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর বাইরে কি আর কিছু করার নেই? পরিবেশ নিয়ে গণমাধ্যম কি আরও বিস্তৃত ভূমিকা রাখতে পারে না; সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে, স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরতে, কিংবা বাস্তব পরিবর্তনের উদ্যোগগুলোকে সামনে আনতে? বাস্তবতায় দেখা যায়, পরিবেশ দিবস এলেই কিছু মানুষ সামাজিক মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেদের সচেতন ও ‘সুশীল’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এরপরই যেন পরিবেশ আন্দোলনের দায় শেষ হয়ে যায়। ফলে পরিবেশ রক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত পরিসরের আনুষ্ঠানিকতা ও প্রদর্শনীর মধ্যেই আটকে থাকে। অথচ প্রকৃত অর্থে এটি হওয়া উচিত একটি ব্যাপক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলন।’
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই সিলেটের সচেতন নাগরিকদের অভিন্ন প্রত্যাশা; শুধু একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের মাধ্যমে নগরীর হারিয়ে যাওয়া সবুজ, জলাশয় ও পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হোক। অন্যথায় প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য পরিচিত সিলেট ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।