প্রকাশিত : ০৭ জুন, ২০২৬ ২৩:০৪ (সোমবার)
হারলেও ব্রাজিল; জিতলেও ব্রাজিল

১৯৯৪ সালের ব্রাজিল দল (ছবি: সংগৃহীত)

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই স্মৃতিকাতরতা, উত্তেজনা, পাওয়া না পাওয়ার হিসাব-নিকাশ আর সমর্থকদের মাঝে খুনসুটি। সেই উত্তেজনাটুকু দরজায় কড়া নাড়ছে। কয়েকদিন পরই শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপকে ঘিরে সমর্থকদের ফেইসবুকের নানা পোস্ট, খুনসুটি আর আলোচনা বারবার স্মৃতিকাতর করে তুলছে। আর সেই কারণেই এই লিখা। 

ছোটবেলা থেকেই আমি ক্রিকেট পাগল মানুষ। অন্য কোন খেলার প্রতি আগ্রহ তেমন একটা ছিল না। তবে সেই সময়ে টিভিতে খেলাধুলা বলতে ঐ বিশ্বকাপই দেখা হতো আমাদের। তাই ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবল বিশ্বকাপও তুমুল আগ্রহ এবং উত্তেজনা নিয়ে দেখতাম পরিবারের সবাই। তখন থেকেই দেখতাম বাংলাদেশে অধিকাংশ দর্শক ফুটবল বলতে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ছাড়া আর কিছুই বুঝে না। এতো ছোট বয়সে নান্দনিকতা আর কতোটুকুই বুঝে মানুষ! তাই নব্বই সালের বিশ্বকাপ সম্পর্কে তেমন কিছুই মনে আসে না। 

কিছুটা জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর ১৯৯৪ সালে প্রথম সমর্থন করি ব্রাজিল দলকে। অনেকটা বাবা-কাকাদের উৎসাহেই এই সমর্থন। রোমারিও, বেবেতো'র কী অসাধারণ জুটি ছিল! পুরো বিশ্বকাপ দাপটের সাথে খেলে অবশেষে ফাইনালে ব্রাজিল। ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টিভিতে ফাইনাল দেখতে বসা একান্নবর্তী পরিবারের সকলে মিলে। মা দিলেন মুড়ি আর চানাচুর; যেন সোনায় সোহাগা। পুরো ম্যাচ জুড়ে তীব্র উত্তেজনা, আতঙ্ক শেষে গোল শূন্য ড্র! এখনো মনে আছে, তীব্র হতাশায় আমি অঝোরে কেঁদেছিলাম। অবশেষে টাই-ব্রেকারে রোবার্তো বেজিও'র মিস আর দুঙ্গা'র হাতে বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ কী জিনিস সেটা সেইবারই প্রথম জেনেছিলাম। এরপর ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে রীতিমত বাজি ধরেই সমর্থন করেছিলাম ব্রাজিলকে। যথারীতি দাপটের সাথে খেলে ফাইনালে ব্রাজিল। ছোট কাকু নিয়ে এলেন আতশবাজি। ব্রাজিলের জয়ে উদযাপনটাও হতে হবে রাজকীয় ঢঙ্গে। কিন্তু হায়, ফ্রান্সের কাছে শোচনীয় পরাজয়! প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। সকালে উঠে শুনলাম পাশের বাসার একজন ব্রাজিলের পরাজয় সহ্য করতে না পেরে হার্ট এ্যাটাক করে মারা গেছেন। 

এরপরের বিশ্বকাপের আগেই শুনলাম কোচ পাল্টেছে ব্রাজিলের। আবারও আশায় বুক বাঁধলাম। কিন্তু নতুন কোচ স্কোলারি দলের সুপার স্টার রোমারিও'কে স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়ে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু করলেন! দলে ফেরার জন্য রোমারিও'র সে কী কান্না! তাতেও মন গললো না কোচের। প্রচণ্ড ক্ষোভে সিদ্ধান্ত নিলাম ব্রাজিলকে আর সমর্থন করবো না। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই দেখলাম অন্যরকম এক ব্রাজিল। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকা, কার্লোস, কাফু, লুসিও, সিলভাসহ আরো কতো জাদুকর! আবারও বুকের পাথর সরিয়ে ফিরলাম ব্রাজিলে। দাপটের সাথে বিশ্বকাপ খেলে অবশেষে চ্যাম্পিয়ান ব্রাজিল। সেইবারই প্রথম নজর কেঁড়েছিল রোনালদিনহো। অনবদ্য এক জাদুকর!  

এরপর থেকে আজ অবধি ব্রাজিলেই মজে আছি। কতো কোচ আসলেন-গেলেন। নতুন নতুন জাদুকরের সাথে পরিচয়ও হলো। কিন্তু বিশ্বকাপ আর ব্রাজিলের কারো হাতেই উঠলো না। তবে আজও স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে আছে রোমারিও'র কান্না জড়ানো মুখটা। সেই স্কোলারিরই খড়গের আঘাতে রোনালদিনহোর বিদায় ঘন্টা। মাঠে প্রতিপক্ষের আঘাতে নেইমারের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে পড়ে থাকা। তবুও ভালোবাসি। ভালোবেসে বুকে আগলে রেখেছি দুইবার কাপ জয়ের আনন্দঘন স্মৃতিটুকু। প্রতিবারই আশায় বুক বাঁধি বিশ্বজয়ের। তবে আগের মত উন্মাদনা এখন আর নেই। আগের মত খেলা দেখে কাঁদিও না। পতাকা কিনে ছাদে টাঙ্গাই না কিংবা জার্সি পরে মিছিলেও যাই না। শুধু ভাল লাগে তাই ভালোবাসাটুকু তুলে রাখি। 

'২৬ বিশ্বকাপে ১৪ জুন মরক্কোর বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু করবে ব্রাজিল। ভিনি, নেইমার, রাফিনহো, দানিলোদের হাত ধরে এই বছরও আশা করি ব্রাজিলই বিশ্বজয় করবে। হেক্সার স্বপ্ন পূরণ হবে সেলেসাওদের। সাম্বার তালে নাচবে সবাই। অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার জন্যও ভালোবাসা থাকলো। ভাল খেলে তারাও আলোচনায় থাকুক। সম্ভব হলে বিশ্বকাপ জিতুক। তবে ট্রলের নামে সমর্থকদের মধ্যকার নোংরামিটা বন্ধ হোক। লিজেন্ডারি খেলোয়াড়দের নাম নিয়ে নোংরামি আর না হোক। খেলার উত্তেজনা খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকুক। নিজেদের মধ্যে মারামারি করে আর কারো রক্ত না ঝরুক। পারস্পরিক সম্পর্কগুলো সুন্দর থাকুক। দিন শেষে ফুটবলেরই জয় হোক।