১৯৯৪ বিশ্বকাপে মেরাডোনা (ছবি: সংগৃহীত)
আমার ছোটবেলাটা কেটেছে ঠাকুমার ভীষণ কড়া শাসনের মধ্যে। পড়াশোনায় আমি যে খুব বড় কোনো মেধাবী ছিলাম তা নয়, তবে লক্ষ্মী ও ভালো ছাত্রী ছিলাম। আমাদের বাড়িতে নিয়মকানুনের কমতি ছিল না; যেমন ধরা যাক, দিনে মাত্র এক ঘণ্টা টিভি দেখার অনুমতি। রাতের সেই নির্দিষ্ট সময়ে আমরা গোগ্রাসে ধারাবাহিক নাটক দেখতাম। 'অয়োময়', 'সংশপ্তক', কিংবা 'কোথাও কেউ নেই'; কী দারুণ সব সৃষ্টি! আর মেকগাইভারের বুদ্ধিদীপ্ত অ্যাডভেঞ্চার কিংবা শুক্রবারের বিকেলের ছায়াছবির জন্য তো সারা সপ্তাহ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতাম।
আমাদের এক পিসাতো ভাই ছিলেন, যাকে আমরা নিজের আপন বড় ভাইয়ের মতোই শ্রদ্ধা করতাম, ভালোবাসতাম। তিনি যা করতেন, আমরাও চোখ বন্ধ করে তা-ই অনুসরণ করতাম। ফুটবল খেলা নিয়ে তখন আমার তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু শুধু ভাইয়ার ফুটবল-প্রেম আর ওর প্রভাবেই একদিন আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসতে শুরু করি। সেই যে শুরু, ফুটবলের প্রতি সেই আবেগ আর আর্জেন্টিনার জন্য সেই ভালোবাসা আজও একবিন্দু কমেনি।
তখন দিয়াগো ম্যারাডোনার নাম শুনলেই আমাদের মনে এক অন্যরকম উন্মাদনা কাজ করত। আমাদের পুরো পরিবারই ছিল আর্জেন্টিনার সমর্থক, যা আজও সত্যি। বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই আমাদের এলাকায় যেন দুর্গেো পূজার মতো উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। বাড়ির ছাদে, সামনে আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা পতাকা উড়ত; চারদিকে শুধু ফুটবল আর ফুটবল নিয়ে অন্তহীন উত্তেজনা।
তবে এই আবহের মধ্যেই একটা মজার বৈচিত্র্য ছিলেন আমাদের প্রাইভেট টিউটর। স্যার ছিলেন ব্রাজিলের পাঁড় সমর্থক! বিশ্বকাপের দিনগুলোতে স্যারের সঙ্গে আমাদের দারুণ মজার সব তর্ক-বিতর্ক লেগে যেত। স্যার হেসে হেসে বলতেন, ‘ব্রাজিলকে সাপোর্ট করলে কিন্তু পড়া কম ধরব!’ দল বদলানোর জন্য স্যারের সেই মিষ্টি 'ঘুষ' দেওয়ার চেষ্টা আজ ভাবলে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। আমাদের সেই প্রিয় শিক্ষক আজ আর এই পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাঁর সেই হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দময় দিনগুলোর স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।
ম্যারাডোনা ছিলেন আমার কৈশোরের নায়ক, আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড়। মনে আছে, এক সাক্ষাৎকারে তিনি যখন বলেছিলেন যে বাংলাদেশ নামে কোনো দেশ আছে কি না তা তিনি জানেন না, শুনে মনটা খুব খারাপ হয়েছিল। অভিমান হয়েছিল, তবুও তাঁর জাদুর প্রতি ভালোবাসা কমেনি। ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে তিনি যখন বিশ্বকাপ থেকে সাসপেন্ড হলেন, আমি ঘরে বসে কতটা কেঁদেছিলাম, তা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে।
ফুটবলের প্রতি, এই সুন্দর খেলাটার প্রতি আমার অনুরাগের হাতেখড়ি হয়েছিল আমার সেই প্রিয় ভাইয়ার হাত ধরে। আজ এত বছর পরও, আমি ভীষণ গর্বের সঙ্গে নিজেকে আর্জেন্টিনার একজন নিবেদিতপ্রাণ ও খাঁটি সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিই। শৈশবের সেই চেনা ছাদ, ঠাকুমার শাসন, আর ম্যারাডোনার জন্য সেই টান; সবকিছু মিলিয়ে ফুটবল আমার কাছে স্রেফ একটা খেলা নয়, আমার জীবনের এক টুকরো সোনালী ইতিহাস।