ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ এলেই আজও মনটা ছুটে যায় শৈশবের সেই দিনগুলোতে। তখন আমাদের প্রত্যন্ত জনপদ শাল্লায় বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি। কিন্তু ফুটবলের আলো ঠিকই পৌঁছে গিয়েছিল গ্রামের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।
বিশ্বকাপ শুরু হলেই যেন পুরো গ্রাম বদলে যেত। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে স্কুল মাঠ, হাট-বাজার; সব জায়গায় একটাই আলোচনা, কে জিতবে বিশ্বকাপ? ব্রাজিল, নাকি আর্জেন্টিনা?
তখন খেলা দেখাটাও ছিল এক বিশাল আয়োজন। আমরা বন্ধুরা মিলে এক টাকা করে চাঁদা তুলতাম। কারও কাছে এক টাকা, কারও কাছে দুই টাকা। সেই টাকা দিয়ে ব্যাটারি ভাড়া করে আনা হতো। গ্রামের যে কয়েকটি বাড়িতে টেলিভিশন ছিল, সেখানেই বসত আমাদের বিশ্বকাপের আসর। খেলা শুরু হওয়ার অনেক আগেই গিয়ে জায়গা দখল করে বসে থাকতাম। বড়রা বসতেন সামনে, আর আমরা ছোটরা গাদাগাদি করে মেঝেতে।
বিশ্বকাপ এলেই শুরু হয়ে যেত পতাকা বানানোর ধুম। বাজার থেকে কাপড় কিনে এনে নিজের হাতে বানাতাম ব্রাজিলের পতাকা। বাঁশ কেটে খুঁটি বানিয়ে ঘরের চাল, উঠান কিংবা বাড়ির সামনে উড়িয়ে দিতাম প্রিয় দলের পতাকা। শুধু আমাদের বাড়ি নয়, পুরো গ্রামজুড়েই তখন উৎসবের আমেজ। ঘরে ঘরে উড়ত ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। দল নিয়ে কত তর্ক, কত মজার খুনসুটি! কিন্তু দিনের শেষে সবাই ছিল এক পরিবারের মতো।
ফুটবল তখন খুব বেশি বুঝতাম না। কিন্তু হলুদ জার্সি পরা দলটাকে দেখলেই বুকের ভেতর অন্যরকম একটা আনন্দ কাজ করত। রোনালদোর গোল, রোনালদিনহোর হাসি, কাকার দৌড়; সবকিছুই যেন ছিল এক অন্যরকম মায়া। সেই মায়া থেকেই কখন যে ব্রাজিলকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তা নিজেও জানি না।
আজ অনেক কিছু বদলে গেছে। বিদ্যুৎ এসেছে, হাতে হাতে স্মার্টফোন এসেছে, খেলা দেখার জন্য আর ব্যাটারি ভাড়া করতে হয় না। কিন্তু সেই এক টাকা করে চাঁদা তোলা, বিশ্বকাপের রাতে বন্ধুদের সঙ্গে জেগে থাকা, গোল হলেই পুরো গ্রামের আনন্দে ফেটে পড়া, আর নিজের হাতে বানানো পতাকা উড়ানোর যে আনন্দ; সেটা আজও কোনো আধুনিক প্রযুক্তি দিতে পারেনি।
হয়তো এ কারণেই ব্রাজিল আমার কাছে শুধু একটি ফুটবল দল নয়। ব্রাজিল মানে শৈশব, ব্রাজিল মানে গ্রামের মানুষগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দ, ব্রাজিল মানে হারিয়ে না যাওয়া কিছু সুন্দর স্মৃতি।
চার বছর পরপর বিশ্বকাপ আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু এক টাকা, একটা ব্যাটারি আর একরাশ ব্রাজিল-প্রেম; এই গল্পটা আজও হৃদয়ের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটায় রয়ে গেছে।