ছবি: সংগৃহীত
আমি আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের একজন ঘোর সমর্থক। আর্জেন্টিনা দলকে সমর্থন করার পেছনে মূলত খেলাধুলার মানসিকতাই কাজ করেছে। ছোটবেলা থেকেই আমি এই দলের ভক্ত। আমার এই ভালোবাসার অন্যতম কারণ ছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তিনি যেন আমার কাছে এক জীবন্ত যাদুকর। তাঁর খেলা যত দেখেছি, ততই মুগ্ধ হয়েছি।
আমার আশপাশে তখন সবাই ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিল। বিষয়টি অনেকটা আবাহনী ও মোহামেডানের মতো দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। লক্ষ্য করতাম, যারা মোহামেডান সমর্থন করত, তাদের অনেকেই আর্জেন্টিনার ভক্ত। তাই স্থানীয়ভাবে মোহামেডান এবং আন্তর্জাতিকভাবে আর্জেন্টিনা; এই ছিল আমার অবস্থান।
মানুষ সাধারণত আর্জেন্টিনা দলের নান্দনিক ও আক্রমণাত্মক খেলার ধরন, ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের জাদু, এবং ঐতিহাসিক নানা আবেগঘন ম্যাচের কারণেই দলটিকে সমর্থন করে।
আমি খেলার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসও পড়তাম। টিভিতে হাইলাইটস দেখতাম। ইতিহাস ঘেঁটে যতটুকু বুঝেছি, ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার বৈরিতা আরও তীব্র হয়। কাকতালীয়ভাবে সেই বছরই অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। পরে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখায়, যার নেতৃত্বে ছিলেন ম্যারাডোনা।
তখন থেকেই ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচগুলো আমি বিশেষ আগ্রহ নিয়ে দেখি। আমার কাছে বিষয়টি যেন মাঠের ভেতরের এক প্রতীকী যুদ্ধ। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলো আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখি এবং আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করি।
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির মতো খেলোয়াড়রা কেবল ফুটবলার নন, বরং বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের কাছে আবেগ ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। বিশেষ করে ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স এবং মেসির দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়; আর্জেন্টিনার সমর্থক বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আর্জেন্টাইন ফুটবলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সৃজনশীলতা, ড্রিবলিং এবং আক্রমণাত্মক খেলা। তাদের এই শৈল্পিক ফুটবলকে অনেকেই “আর্ট অব ফুটবল” বলে থাকেন, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
ছোটবেলায় আমি আর্জেন্টিনার বিশাল একটি পতাকা ছাদের উপর লাগিয়ে দিয়েছিলাম। পুরো এলাকায় নিজেকে আর্জেন্টিনার একজন “ডাই-হার্ড” ফ্যান হিসেবে পরিচিত করেছিলাম। ব্রাজিল সমর্থকদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কও হতো নিয়মিত। মেসির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য জার্সি কিনতাম, আর এখনো বিশ্বকাপ এলে নিজের ও পরিবারের জন্য জার্সি কিনি। সবাই মিলে জার্সি পরে খেলা উপভোগ করি; সেই মুহূর্তগুলো সত্যিই আনন্দময়।
বাংলাদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থনের উন্মাদনা শুরু হয় মূলত আশির দশক থেকে। সত্তরের দশকের পর টেলিভিশনের প্রসারের ফলে মানুষ এই দুই দলের খেলোয়াড়দের সরাসরি দেখতে শুরু করে। সেই সময় থেকেই দুই দলের ভক্তদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
এ প্রসঙ্গে পেলে এবং ম্যারাডোনা; দুজনেই ফুটবল ইতিহাসের দুই মহান কিংবদন্তি। পেলে ব্রাজিলের হয়ে চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনবার চ্যাম্পিয়ন হন এবং “ফুটবলের রাজা” হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ম্যারাডোনা ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভা, যিনি তাঁর ড্রিবলিং ও নেতৃত্ব দিয়ে ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
পরবর্তীতে রোনালদো, কাকা, রোনালদিনহো, নেইমার, বাতিস্তুতা, মাসচেরানো, আগুয়েরো, ডি মারিয়া, দিবালা; এমন অসংখ্য তারকা খেলোয়াড় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে সমর্থনের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশে এই দুই দলের সমর্থক সবচেয়ে বেশি।
তবে ম্যারাডোনা শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ধনী ও ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিল। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে তিনি যখন মাঠে নামতেন, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্ত তাঁর সঙ্গে মাঠে নামার অনুভূতি পেত।
এই আবেগ, ইতিহাস এবং ফুটবলের সৌন্দর্যের কারণেই আমি আর্জেন্টিনার একজন গর্বিত সমর্থক।