ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের আসর নয়; এটি আবেগ, স্বপ্ন আর ইতিহাস রচনার মহামঞ্চ। তবে কিছু বিশ্বকাপ আছে, যেগুলো শিরোপার উজ্জ্বলতার পাশাপাশি বিতর্কের কালো ছায়াতেও আচ্ছন্ন। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ঠিক তেমনই এক অধ্যায়, যেখানে গৌরব আর প্রশ্নবোধক চিহ্ন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে আজও।
সেই বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে আর্জেন্টিনা। বুয়েনস এইরেসের আকাশে উড়েছিল বিজয়ের পতাকা, লাখো মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল উল্লাস। কিন্তু প্রায় অর্ধশতক পরও একটি প্রশ্ন ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ে; এটি কি নিখাদ ফুটবলীয় সাফল্য ছিল, নাকি ক্ষমতার প্রভাব ও বিতর্কে ঘেরা একটি শিরোপা?
তৎকালীন আর্জেন্টিনা ছিল সামরিক জান্তার শাসনে। দেশজুড়ে চলছিল রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। সমালোচকদের মতে, বিশ্বকাপ ছিল সেই সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার এক সুবর্ণ সুযোগ।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ঘিরে ফেলে আয়োজকদের। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডে পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৬-০ গোলের জয়। ফাইনালে উঠতে স্বাগতিকদের প্রয়োজন ছিল অন্তত চার গোলের ব্যবধানে জয়। সে সময়ের শক্তির বিচারে এমন ফলাফল অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল।
এই ম্যাচ ঘিরে নানা অভিযোগ আজও ইতিহাসের পাতায় ঘুরে বেড়ায়। পেরুর গোলরক্ষক ছিলেন আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত। এছাড়া সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে পেরুর খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ কখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবু সন্দেহের মেঘ পুরোপুরি কাটেনি।
আরও বিতর্ক তৈরি হয় ম্যাচ সূচি নিয়ে। সমালোচকদের দাবি, স্বাগতিক দলের সুবিধা নিশ্চিত করতে সূচিতে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল। অন্যদিকে পুরো টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকেও ফাইনালে উঠতে পারেনি ব্রাজিল। ফলে অনেক ব্রাজিলিয়ান সমর্থক ও বিশ্লেষক নিজেদের দলকে সেই আসরের ‘নৈতিক চ্যাম্পিয়ন’ বলে আখ্যা দেন।
অন্যদিকে বিশ্বকাপটি ছিল নতুন ইতিহাস রচনারও মঞ্চ। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেয় ইরান ও তিউনিসিয়া, যা এশিয়া ও আফ্রিকার ফুটবলের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে। একই সময়ে ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম ও উরুগুয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী দল মূল পর্বে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়।
নেদারল্যান্ডসও এসেছিল শিরোপার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ ব্যক্তিগত নিরাপত্তাজনিত কারণে টুর্নামেন্টে অংশ নেননি। পরে জানা যায়, তার পরিবারের ওপর অপহরণের চেষ্টা হয়েছিল। ক্রুইফের অনুপস্থিতি ডাচদের শক্তিকে নিঃসন্দেহে দুর্বল করে দেয়।
ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডস। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে ডাচদের সমতাসূচক গোল ম্যাচকে নিয়ে যায় অতিরিক্ত সময়ে। কিন্তু সেখানেই জ্বলে ওঠেন মারিও কেম্পেস। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে এবং প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের করে নেয়।
বিজয়ের আনন্দে যখন আর্জেন্টিনার রাস্তাঘাট উৎসবে মুখর, তখন ডাচ শিবিরে ছিল ক্ষোভ। নেদারল্যান্ডসের কয়েকজন খেলোয়াড় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বর্জন করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে স্বাগতিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল।
তবুও পরিসংখ্যানের ভাষায় ১৯৭৮ বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বজয়ের গল্প। মারিও কেম্পেস জাতীয় বীরের মর্যাদা পান, আর কোচ সিজার লুইস মেনোত্তির আক্রমণাত্মক ফুটবল বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ায়।
কিন্তু ইতিহাস কেবল ট্রফির গল্প লিখে না; ইতিহাস প্রশ্নও মনে রাখে। তাই ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপকে কেউ দেখেন আর্জেন্টিনার গৌরবময় উত্থান হিসেবে, আবার কেউ দেখেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ শিরোপাগুলোর একটি হিসেবে।
ফুটবলের সৌন্দর্য হয়তো সময়ের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়, কিন্তু ১৯৭৮ বিশ্বকাপকে ঘিরে বিতর্কের ছায়া আজও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।