ছবি: সংগৃহীত
ফুটবল ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত শুধু খেলার অংশ নয়, সেগুলো হয়ে ওঠে সময়ের সাক্ষী। ১৯৮৬ সালের সেই গ্রীষ্মের বিকেলে মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে যা ঘটেছিল, তা আজও কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে জীবন্ত। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এক জাদুকর; দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। প্রথমে বিতর্ক, তারপর বিস্ময়। এক ম্যাচেই ফুটবল বিশ্ব দেখেছিল দুটি ভিন্ন রূপ; ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। প্রথম গোলটি নিয়ে আজও বিতর্ক থামেনি। কিন্তু দ্বিতীয় গোলটির সামনে সব বিতর্ক যেন মাথা নত করে দাঁড়ায়।
মাঝমাঠ থেকে বল পায়ে নিয়ে একে একে ছয়জন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ৬২ মিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন ম্যারাডোনা। যেন তিনি দৌড়াচ্ছিলেন না, নাচছিলেন। বলটি ছিল তাঁর পায়ের সঙ্গে অদৃশ্য কোনো সুতোয় বাঁধা। সেই মুহূর্তে ফুটবল আর সাধারণ খেলা ছিল না; হয়ে উঠেছিল শিল্প, কবিতা, বিস্ময়ের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আজও অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে-সেই বলটি এখন কোথায়?
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর বলটি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন তিউনিসিয়ার রেফারি আলি বিন নাসের। বছরের পর বছর ধরে তিনি সযত্নে সংরক্ষণ করেছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মূল্যবান স্মারকটি। ২০২২ সালে ম্যারাডোনার সেই ম্যাচে পরা জার্সি যখন ৯.২৮ মিলিয়ন ডলারে নিলামে বিক্রি হলো, তখন আলোচনায় আসে বলটিও।
আলি বিন নাসের চেয়েছিলেন বলটিকেও নিলামে তুলতে। কিন্তু ইতিহাসের মূল্য সবসময় টাকায় মাপা যায় না। সর্বোচ্চ ২.৪ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব এলেও তা নির্ধারিত মূল্য স্পর্শ করতে পারেনি। ফলে বিক্রি হয়নি সেই বল। আজও সেটি রয়ে গেছে রেফারির কাছেই; সময়ের এক নীরব সাক্ষী হয়ে।
এখানেই যেন ফুটবলপ্রেমীদের একটুখানি অনুশোচনা রয়ে যায়। হয়তো বলটি কোনো জাদুঘরে থাকলে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ কাছ থেকে দেখতে পারত সেই ইতিহাসের স্পর্শ। হয়তো নতুন প্রজন্ম বুঝতে পারত, কেন একটি বল শুধুই চামড়া আর বাতাস নয়; কেন সেটি কোটি মানুষের আবেগ, স্মৃতি আর স্বপ্নের প্রতীক।
ম্যারাডোনা নেই। তাঁর বাঁ পায়ের জাদুও আর দেখা যাবে না। কিন্তু সেই বলটি এখনও আছে-একটি অসমাপ্ত গল্পের মতো। হয়তো কোনো কাচের বাক্সে নয়, কোনো প্রদর্শনীতে নয়; তবু সেটি বয়ে বেড়াচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্ক আর সবচেয়ে সুন্দর গোলের স্মৃতি।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু হারিয়ে যায়। কিন্তু ১৯৮৬ সালের সেই বলটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়; কিছু মুহূর্ত কখনও পুরোনো হয় না, কিছু কিংবদন্তি কখনও মরে না। আর কিছু অনুশোচনা থেকে যায়, ইতিহাসকে আরও একটু কাছ থেকে ছুঁতে না পারার আক্ষেপ হয়ে।