প্রকাশিত : ১০ জুন, ২০২৬ ১৮:০৭ (বৃহস্পতিবার)
একজন আজীবন আর্জেন্টিনা-সমর্থকের দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি: সংগৃহীত

(১৯৯০ সালের ফাইনালের বেদনা, ১৯৯৪ সালের হতাশা, ১৯৯৮ ও ২০০৬-এর অপূর্ণতা, ২০১৪ সালের হৃদয়ভাঙা ফাইনাল; সবকিছুর মধ্য দিয়েই আর্জেন্টিনাকে ভালোবেসেছি। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে আমার প্রত্যাশা শুধু আরেকটি ট্রফি নয়; আমি দেখতে চাই সেই নীল-সাদা জার্সির লড়াকু মনোভাব, যে মনোভাব ম্যারাডোনার সময়ে ছিল এবং আজ মেসির নেতৃত্বে নতুন রূপে বেঁচে আছে।)

ফুটবল আমার কাছে শুধুমাত্র একটি খেলা নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি, উত্তরাধিকার এবং পরিচয়ের একটি অংশ। আমার আর্জেন্টিনা-প্রেমের শুরু আজকের নয়। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ থেকে আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। সেই সময় বিশ্ব ফুটবলের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ছিল দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। তাঁর জাদুকরী পায়ের ছোঁয়া, অদম্য নেতৃত্ব এবং দেশের জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। আমার বাবা নিজেও ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ আর্জেন্টিনা-সমর্থক। তাঁর কাছ থেকেই আমি প্রথম আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসতে শিখি। সেই ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে।

আমার কাছে ম্যারাডোনা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার। তিনি শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড় ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি যুগ, একটি আবেগ, একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তাঁর খেলা দেখেই আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছিলাম। এরপর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য আনন্দ, বেদনা, আশা ও হতাশার মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে আমার পথচলা অব্যাহত রয়েছে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল আর্জেন্টিনা-সমর্থকদের জন্য এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। সেই বিজয় শুধুমাত্র একটি ট্রফি জয় ছিল না; এটি ছিল কয়েক প্রজন্মের স্বপ্নপূরণ। যারা ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ জয়ের গল্প শুনে বড় হয়েছে, তাদের জন্য ২০২২ ছিল এক অবর্ণনীয় অনুভূতির নাম।

আজ যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকাই, তখন আবারও আশার আলো দেখতে পাই। আর্জেন্টিনা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সুশৃঙ্খল এবং ভারসাম্যপূর্ণ দল। লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলটি শুধুমাত্র প্রতিভার উপর নির্ভরশীল নয়; বরং দলগত সমন্বয়, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং মানসিক দৃঢ়তাকে শক্তিতে পরিণত করেছে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাদের ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে যে এটি কোনো সাময়িক উত্থান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল।

লিওনেল মেসির প্রসঙ্গ এলে বিশেষভাবে বলতে হয়, তিনি ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। অনেকেই তাঁকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার বলে মনে করেন। আমার ব্যক্তিগত আবেগে ম্যারাডোনা সর্বোচ্চ স্থানে থাকলেও মেসির অসাধারণ প্রতিভা, ধারাবাহিকতা এবং বিনয় আমাকে মুগ্ধ করে। ২০২২ সালে তিনি যে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা একজন প্রকৃত অধিনায়কের উদাহরণ হয়ে থাকবে। মেসি শুধু গোল করেন না; তিনি দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ান, খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তরুণ খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেন।

২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা রয়েছে। তিনি হয়তো আগের মতো প্রতি ম্যাচে ৯০ মিনিট দৌড়াবেন না, কিন্তু অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং ম্যাচের গতি বদলে দেওয়ার সামর্থ্য এখনও তাঁকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় করে রেখেছে। তাছাড়া জুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, লাউতারো মার্টিনেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরোসহ নতুন প্রজন্মের তারকারা এখন অনেক বেশি পরিণত।

বিশ্বকাপ জয় কখনোই সহজ নয়। ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি কিংবা পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলগুলোও শিরোপার দাবিদার। একটি খারাপ দিন, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা একটি অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত পুরো টুর্নামেন্টের চিত্র বদলে দিতে পারে। তাই শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। তবে একজন দীর্ঘদিনের সমর্থক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের মধ্যে সেই মানসিক শক্তি, প্রতিভা এবং জয়ের সংস্কৃতি রয়েছে, যা তাদের আবারও শিরোপার লড়াইয়ে এগিয়ে রাখবে।

একজন ডাই-হার্ট আর্জেন্টিনা-সমর্থক হিসেবে আমি জানি, সমর্থন মানে শুধু জয়ের সময় পাশে থাকা নয়। ১৯৯০ সালের ফাইনালের বেদনা, ১৯৯৪ সালের হতাশা, ১৯৯৮ ও ২০০৬-এর অপূর্ণতা, ২০১৪ সালের হৃদয়ভাঙা ফাইনাল; সবকিছুর মধ্য দিয়েই আর্জেন্টিনাকে ভালোবেসেছি। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে আমার প্রত্যাশা শুধু আরেকটি ট্রফি নয়; আমি দেখতে চাই সেই নীল-সাদা জার্সির লড়াকু মনোভাব, যে মনোভাব ম্যারাডোনার সময়ে ছিল এবং আজ মেসির নেতৃত্বে নতুন রূপে বেঁচে আছে।

ফুটবল ইতিহাসে ম্যারাডোনা ও মেসি; দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকা। একজন আমাকে আর্জেন্টিনার প্রেমে ফেলেছিলেন, আরেকজন সেই ভালোবাসাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের আনন্দে পূর্ণ করেছেন। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ আমার কাছে শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি একটি দীর্ঘ যাত্রার পরবর্তী অধ্যায়।

আমি বিশ্বাস করি, যদি আর্জেন্টিনা নিজেদের সেরা খেলাটি খেলতে পারে, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপেও তারা শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার হবে। আর যদি ভাগ্য, পরিশ্রম ও দলগত শক্তি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে হয়তো ফুটবল বিশ্ব আবারও দেখতে পারে আকাশে উড়তে থাকা সেই পরিচিত নীল-সাদা পতাকা; বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার পতাকা।