ছবি: সংগৃহীত
ফুটবল কখনো কখনো শুধু একটি খেলা নয়, এটি হয়ে ওঠে আবেগ, প্রত্যাশা আর প্রত্যাবর্তনের এক জীবন্ত গল্প। মেক্সিকোর গুয়াদালহারার সাপোপানের সবুজ গালিচায় সেই গল্পই লিখল দক্ষিণ কোরিয়া। পিছিয়ে পড়েও হার না মানার মানসিকতা, আক্রমণের ধারাবাহিকতা আর দুর্দান্ত লড়াইয়ে চেকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু করল এশিয়ার টাইগাররা।
প্রথমার্ধে গোলশূন্য স্কোরলাইন যেন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণের ধারায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় দক্ষিণ কোরিয়া। একের পর এক আক্রমণে চেকিয়ার রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে তারা। কিন্তু কখনো ডিফেন্ডারের বাধা, কখনো গোলকিপার মাতেই কোভারের দৃঢ়তায় গোলের দেখা মিলছিল না।
অন্যদিকে চেকিয়াও সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু তমাস সৌচেক ও পাত্রিক শিকের ব্যর্থতায় প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলহীন সমতায়।
বিরতির পর যেন আরও ক্ষুধার্ত হয়ে মাঠে নামে কোরিয়ানরা। আক্রমণের পর আক্রমণে চেকিয়ার রক্ষণভাগে চাপ বাড়তে থাকে। তবে ফুটবলের চিরচেনা নিয়ম মেনেই খেলার ধারার বিপরীতে ৫৯ মিনিটে এগিয়ে যায় চেকিয়া। ভ্লাদিমির চৌফালের দীর্ঘ থ্রো থেকে অধিনায়ক লাদিস্লাভ ক্রেইচির শক্তিশালী হেড জড়িয়ে যায় জালে। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে চেক শিবির।
কিন্তু এই গোল দক্ষিণ কোরিয়ার মনোবল ভাঙতে পারেনি। বরং যেন আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। তারা আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, আরও বেশি বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের দিকে।
অবশেষে ৬৭ মিনিটে আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। লি গাং-ইনের নিখুঁত পাস ধরে বক্সে ঢুকে অসাধারণ দক্ষতায় গোলকিপারের ওপর দিয়ে বল তুলে দেন হং ইন-বম। ধীর গতিতে গড়িয়ে যাওয়া বলটি যখন জালে আশ্রয় নেয়, তখন যেন পুরো কোরিয়ান শিবিরে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়।
সমতার আনন্দ কাটতে না কাটতেই নাটকীয়তা আরও বাড়ে। ৭৭ মিনিটে তমাস সৌচেকের হেড জালে জড়ালেও অফসাইডের পতাকায় থেমে যায় চেকিয়ার স্বপ্ন। সেই হতাশার রেশ না কাটতেই আসে ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।
৮০ মিনিটে হং ইন-বমের সূক্ষ্ম পাস থেকে ওহ হিউন-গিউর নেওয়া শট গোলকিপারের হাতে লেগেও জালে ঢুকে যায়। মুহূর্তেই স্টেডিয়ামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কোরিয়ান উল্লাস। সেই গোলই হয়ে ওঠে জয়ের স্বাক্ষর।
শেষদিকে মরিয়া হয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে চেকিয়া। কিন্তু গোলরক্ষক কিম সুং-গিউ দু’দুবার দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। ফলে শেষ বাঁশি বাজতেই বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে দক্ষিণ কোরিয়া।
এই ম্যাচে বলের দখলে ছিল কোরিয়ার স্পষ্ট আধিপত্য। ৬২ শতাংশ সময় বল নিজেদের কাছে রেখে তারা গোলে ১৫টি শট নেয়, যার সাতটি ছিল লক্ষ্যে। স্কোরলাইন হয়তো তাদের দাপট পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারেনি, কিন্তু মাঠে তাদের ফুটবল ছিল আত্মবিশ্বাস, সাহস ও প্রত্যাবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ।
বিশেষ করে দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডের খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অধিনায়ক সন হিউং-মিন এদিন একাধিক সুযোগ নষ্ট করলেও তার দল তাকে হতাশ হতে দেয়নি। সতীর্থদের লড়াকু মানসিকতা আর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জয় এসেছে, আর সেই জয়ই হয়তো নতুন স্বপ্ন দেখাবে কোরিয়ানদের।
২০১০ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে জয়; দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এটি শুধু তিন পয়েন্ট নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল ঘোষণা। বিশ্বমঞ্চে তারা জানিয়ে দিল, লড়াই শেষ না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়াকে কখনোই হারিয়ে দেওয়া যায় না।