প্রকাশিত : ১৩ জুন, ২০২৬ ০০:১৫ (শনিবার)
হেক্সা জয়ের মিশনে চাপহীন ব্রাজিলের নতুন সমীকরণ

ছবি: সংগৃহীত

​ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ের পাতায় কালো মানিক পেলের জাদুকরী উপাখ্যান পড়া, আর টেলিভিশনের পর্দায় হলুদ-সবুজ জার্সির ‘জোগো বোনিতো’ (নান্দনিক ফুটবল) দেখে বুঁদ হওয়া; এভাবেই বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসার জন্ম। লাতিন আমেরিকার এই দেশটি কেবল ফুটবল খেলে না, ফুটবলকে এক জীবন্ত শিল্পে রূপ দেয়। তবে অতীত ইতিহাসের সেই সোনালী অধ্যায়ের পর, বিগত কয়েকটি বিশ্বকাপে সেলেসাওদের পারফরম্যান্স ভক্তদের মনে কিছুটা হলেও হতাশার জন্ম দিয়েছে। প্রত্যাশার আকাশচুম্বী চাপ আর নকআউট পর্বের স্নায়ুযুদ্ধ; সব মিলিয়ে ব্রাজিল যেন তার চিরচেনা ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিল।
​তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। অতীতের ব্যর্থতা গ্লানি নয়, বরং এক নতুন শক্তির জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে এবারের দলে। আর তাই, এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, বরং ট্রফি জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার।

​অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের এক অপূর্ব মহাকাব্য
​এবারের ব্রাজিল দলটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি অভিজ্ঞতার পরিপক্কতা এবং তারুণ্যের ক্ষিপ্রতার এক দুর্দান্ত মিশ্রণ। দলে আছেন নেইমার জুনিয়র, ক্যাসেমিরো এবং অ্যালিসন বেকারের মতো বিশ্বসেরা ও অভিজ্ঞ ফুটবলাররা। মাঠের ভেতরে ও বাইরে তরুণদের পথ দেখাতে এবং কঠিন মুহূর্তে দলের হাল ধরতে এই সিনিয়রদের জুড়ি নেই। বিশেষ করে মাঝমাঠে ক্যাসেমিরোর প্রাচীর আর গোলপোস্টের নিচে অ্যালিসনের বিশ্বস্ত হাত দলকে দেয় এক পরম স্বস্তি।
​তারুণ্যের ক্ষিপ্রতা: সিনিয়রদের এই অভিজ্ঞতার ঢালকে সঙ্গী করে মাঠে ঝড় তুলতে প্রস্তুত একঝাঁক তরুণ ও অতিমানবীয় স্কিলের অধিকারী ফুটবলার। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র,  কিংবা এন্ড্রিকদের মতো তরুণ তুর্কিরা ইউরোপিয়ান ফুটবলে নিজেদের জাত চিনিয়ে এখন জাতীয় দলকে ষষ্ঠ ট্রফি এনে দিতে মরিয়া। তাদের গতি, ড্রিবলিং এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ব্রাজিলের আক্রমণে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

​ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ অনেক সময়ই তারা নিজেরা এবং তাদের ওপর থাকা কোটি ভক্তের প্রত্যাশার চাপ। কিন্তু এবারের দলটির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, তারা মাঠে নামছে একবারে নির্ভার হয়ে। ‘ফুটবল যখন আনন্দের উৎস হয়, তখন পা থেকে স্কিল ঝরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।’

​বিগত আসরগুলোর মতো এবার আর ব্রাজিল কোনো একক মহাতারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। আক্রমণ থেকে রক্ষণ; সবখানেই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মতো একাধিক ম্যাচ উইনার রয়েছে। এই 'চাপহীন' ও 'নির্ভার' ফুটবল খেলার মানসিকতাই বদলে দিতে পারে পুরো দৃশ্যপট। যখন পেলের উত্তরসূরিরা মাথায় কোনো বোঝা না নিয়ে কেবল নিজেদের স্বাভাবিক ও নান্দনিক ফুটবলটা উপভোগ করবে, তখন মাঠের ফলাফল তাদের পক্ষে আসতে বাধ্য।

​ফুটবলপ্রেমীদের শৈশবের সেই আবেগ, পেলের সেই চিরন্তন ঐতিহ্য আর সাম্বা নৃত্যের ছন্দে ব্রাজিল এবার ভিন্ন কিছু উপহার দিতে বদ্ধপরিকর। তারুণ্যের জয়গান আর অভিজ্ঞতার দূরদর্শিতাকে পুঁজি করে, চাপমুক্ত ফুটবল শৈলী প্রদর্শনের মাধ্যমে সাম্বার দেশ লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল এবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করবে; এটাই বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি সেলেসাও ভক্তের একান্ত প্রত্যাশা। নান্দনিক ফুটবলের স্রষ্টারা এবার ট্রফি জিতেই মাঠ ছাড়বে, এমন বিশ্বাস ফুটবল রোমান্টিকদের মনে দোলা দিয়ে যাচ্ছে।