প্রকাশিত : ১৩ জুন, ২০২৬ ০১:১০ (শনিবার)
হেক্সা আসবেই, ব্রাজিল কখনো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে না

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ এলেই পৃথিবী যেন দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়; এক ভাগ পরিসংখ্যানের, অন্য ভাগ আবেগের। পরিসংখ্যান বলে কে কত শক্তিশালী, কার সম্ভাবনা কত বেশি; আর আবেগ বলে, হৃদয় যাকে বেছে নিয়েছে, বিজয়ের মুকুটও তারই প্রাপ্য। সেই আবেগের নাম যদি হয় ব্রাজিল, তাহলে ফুটবল শুধু খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে এক অনন্ত প্রেমের গল্প।

হলুদ-সবুজ জার্সির দিকে তাকালেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক দীর্ঘ ইতিহাস। ইতিহাস, যেখানে রয়েছে সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা, শিল্প আর জয়ের মহাকাব্য। ফুটবলকে শুধু গোল আর ফলাফলের সীমায় আটকে না রেখে যে দেশ নৃত্যের ছন্দে, সংগীতের সুরে এবং শিল্পের মাধুর্যে বিশ্বকে নতুন এক ফুটবলের ভাষা শিখিয়েছে, সেই দেশের নাম ব্রাজিল।

বিশ্বকাপের মাঠে ব্রাজিল মানেই এক অন্যরকম উন্মাদনা। যেন দূর আকাশে সাম্বার ঢোল বাজতে শুরু করেছে, আর সেই তালে তালে কাঁপছে কোটি কোটি সমর্থকের হৃদয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দলটি শুধু ম্যাচ জেতেনি, মানুষের ভালোবাসাও জিতেছে।

ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে কত শত কিংবদন্তির নাম। পেলের জাদুকরী পায়ের ছোঁয়া, জিকোর শিল্পিত ফুটবল, রোমারিওর ক্ষুরধার আক্রমণ, রোনালদো নাজারিওর বিস্ফোরক গতি, রোনালদিনহোর হাসিমাখা জাদু কিংবা কাকার নান্দনিকতা; সব মিলিয়ে ব্রাজিল ফুটবলকে দিয়েছে এক অনন্য পরিচয়। সেই উত্তরাধিকার বহন করেছেন নেইমার, আর আজ তা পৌঁছে গেছে নতুন প্রজন্মের হাতে।

২০২৬ বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলটিকে ঘিরেও তাই আশার আলো কম নয়। গোলবারের নিচে অ্যালিসন বেকার ও এডারসনের বিশ্বমানের উপস্থিতি দলকে দেয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। রক্ষণভাগে মারকুইনহোস নেতৃত্ব দিচ্ছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। মাঝমাঠে অভিজ্ঞ কাসেমিরো যেন দলের মেরুদণ্ড। আর আক্রমণভাগে নেইমারের সঙ্গে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, রদ্রিগো ও এন্দ্রিকের উপস্থিতি প্রতিপক্ষের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।

নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির হাত ধরে ব্রাজিল যেন নতুন আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম সফল এই কোচের অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত দক্ষতা ব্রাজিলকে আরও সংগঠিত ও পরিণত করেছে। তাঁর অধীনে দলটি শুধু প্রতিভার উপর নির্ভর করছে না, বরং শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা ও দলগত সমন্বয়ের এক নতুন অধ্যায় রচনা করছে।

তবে ব্রাজিলকে ভালোবাসার কারণ শুধু বর্তমান দল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি। কারও শৈশব কেটেছে রোনালদোর গোল দেখে, কারও কৈশোর রোনালদিনহোর হাসিতে মুগ্ধ হয়ে। কেউ হয়তো প্রথম ফুটবল চিনেছে ব্রাজিলের খেলা দেখে। তাই ব্রাজিলের প্রতি সমর্থন অনেক সময় যুক্তির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।

ফুটবলে নিশ্চিত কিছু নেই। সবচেয়ে শক্তিশালী দলও হেরে যেতে পারে, আবার অসম্ভবকে সম্ভবও করে দেখাতে পারে কোনো দল। তবু একজন ব্রাজিল সমর্থক প্রতিটি বিশ্বকাপে একই স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নের নাম; হেক্সা।

১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ এই পাঁচটি বছর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের গৌরবগাঁথা হয়ে আছে। পাঁচটি তারকা আজও ব্রাজিলের জার্সিতে জ্বলজ্বল করে। কিন্তু কোটি সমর্থকের চোখ এখন ষষ্ঠ তারকার দিকে। সেই বহু প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’ যেন এক অপূর্ণ কবিতা, যার শেষ লাইনটি এখনও লেখা হয়নি।

বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রত্যাশা। প্রতিটি ম্যাচে, প্রতিটি আক্রমণে, প্রতিটি গোলের সুযোগে সমর্থকদের হৃদস্পন্দন বেড়ে যাবে। কারণ ব্রাজিলের খেলা মানে শুধু ৯০ মিনিট নয়; এটি একটি জাতির ফুটবল ঐতিহ্য, কোটি মানুষের আবেগ এবং সীমাহীন ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।

আমাদের বিশ্বাস, আমাদের ভালোবাসা, আমাদের প্রার্থনা; সবই ব্রাজিলের সঙ্গে। হয়তো ভবিষ্যৎ কেউ জানে না, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে তো বাধা নেই। আর ব্রাজিলের সমর্থকরা কখনো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে না।

হয়তো আবারও সাম্বার ছন্দে মুখর হবে স্টেডিয়াম। হয়তো আবারও আকাশজুড়ে উড়বে হলুদ-সবুজ পতাকা। হয়তো আবারও বিশ্ব শুনবে বিজয়ের উল্লাস।

কারণ ব্রাজিল শুধু একটি ফুটবল দল নয়; এটি এক অনুভূতি, এক ইতিহাস, এক অমর ভালোবাসা।

আর সেই ভালোবাসার কণ্ঠে আজও প্রতিধ্বনিত হয় একটাই স্লোগান-‘হেক্সা আসবেই, কারণ ব্রাজিল কখনো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে না।’