২০২২ ফুটের আর্জেন্টিনার পতাকা (ছবি: সংগৃহীত)
বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় বাংলাদেশের চিত্র। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের ব্যস্ত মোড়, স্কুলের মাঠ থেকে নদীর পাড়-সবখানেই শুরু হয় ফুটবল নিয়ে তর্ক, আলোচনা আর আবেগের উৎসব। হাজার মাইল দূরের কোনো দেশের পতাকা তখন হয়ে ওঠে নিজের ভালোবাসার প্রতীক। সেই ভালোবাসা কখনো রঙ ছড়িয়ে দেয় দেয়ালে, কখনো মিশে যায় মিছিলের উচ্ছ্বাসে, আবার কখনো রূপ নেয় ইতিহাস গড়ার মতো ব্যতিক্রমী আয়োজনে।
এবার সেই ভালোবাসার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন পাবনার চাটমোহর উপজেলার বালুদিয়া গ্রামের আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা। বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনাকে বুকে ধারণ করে তারা তৈরি করেছেন ২০২২ ফুট দৈর্ঘ্যের বিশাল এক আর্জেন্টিনার পতাকা, যা শুধু একটি কাপড়ের টুকরো নয়; বরং হাজারো সমর্থকের আবেগ, ভালোবাসা এবং স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ।
শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকাটি নিয়ে গ্রামজুড়ে মিছিল বের করা হয়। পরে গ্রামের বিভিন্ন সড়কে টাঙিয়ে দেওয়া হয় বিশালাকৃতির এই পতাকা। নীল-সাদা রঙের সেই দীর্ঘ পতাকা যখন গ্রামের পথজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হচ্ছিল যেন আর্জেন্টিনার কোনো উৎসব এসে নেমেছে বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত জনপদে।
সমর্থকদের দাবি, ২০২২ ফুট দৈর্ঘ্যের এই পতাকা শুধু পাবনা নয়, সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যেই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্জেন্টিনা পতাকা। প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করছেন পতাকাটি এক নজর দেখার জন্য। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ বিস্ময়ভরা চোখে দেখছেন একদল তরুণের স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার গল্প।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন গ্রামের তিন তরুণ; রাসেল মাহমুদ, সেলিম হোসেন ও আলামিন হোসেন। বিশ্বকাপের দামামা বাজতেই তারা ভাবতে শুরু করেন, কীভাবে নিজেদের প্রিয় দল আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসাকে অন্যদের চেয়ে ভিন্নভাবে প্রকাশ করা যায়। দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতিকে ধারণ করে ২০২২ ফুট দীর্ঘ একটি পতাকা তৈরি করা হবে।
শুধু ভাবনা নয়, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে আসেন গ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কৃষক, প্রবাসীসহ অসংখ্য আর্জেন্টিনা সমর্থক আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা করেন। প্রায় ১০ দিন ধরে চলে নিরলস পরিশ্রম। সেলাইয়ের পর সেলাই, মাপের পর মাপ, রঙের পর রঙ মিলিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় বিশাল পতাকাটি। পরে তাতে সংযোজন করা হয় আর্জেন্টিনা দলের লোগো। পুরো কাজে ব্যয় হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
তরুণ উদ্যোক্তারা জানান, ছোটবেলা থেকেই তারা লিওনেল মেসির খেলার ভক্ত। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে মেসির হাতে যখন বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঠেছিল, তখন সেই আনন্দে ভেসেছিল গোটা বিশ্ব। সেই স্মৃতিকে অমলিন রাখতেই তাদের এই আয়োজন। তাদের বিশ্বাস, মেসির শেষ বিশ্বকাপেও আবারও সাফল্যের ইতিহাস লিখবে আর্জেন্টিনা।
গ্রামের প্রবীণ সমর্থক সিদ্দিকুর রহমান ও মহরম আলীর চোখেও এই পতাকা শুধু কাপড় নয়, এটি ভালোবাসার প্রতীক। তারা আশা প্রকাশ করেন, এবারও আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতবে। তবে ফুটবলের সৌন্দর্য অটুট রাখতে তারা ব্রাজিলের প্রতিও শুভকামনা জানান। তাদের স্বপ্ন, ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে ফাইনালে মুখোমুখি হোক।
পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল করিম তারেক এই উদ্যোগকে অভিনব ও প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, খেলাধুলা মানুষকে সম্প্রীতির বার্তা দেয়। তরুণদের এই উচ্ছ্বাস ইতিবাচক শক্তিতে পরিণত হোক, এটাই সবার প্রত্যাশা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে বাংলাদেশের সমর্থকদের উন্মাদনা নতুন নয়। কিন্তু বালুদিয়া গ্রামের এই আয়োজন যেন সেই ইতিহাসে যুক্ত করল নতুন একটি অধ্যায়। ২০২২ ফুট দীর্ঘ পতাকাটি আজ শুধু আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থনের প্রতীক নয়; এটি প্রমাণ করে, ফুটবল কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা মানে না। ভালোবাসা, আবেগ আর স্বপ্নের ভাষা পৃথিবীর সব প্রান্তেই এক।
আর তাই পাবনার আকাশে উড়তে থাকা সেই নীল-সাদা পতাকা যেন বারবার বলে যায়; ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতির নাম।