প্রকাশিত : ১৩ জুন, ২০২৬ ০২:৩৯ (শনিবার)
বিশ্বকাপের মঞ্চে লাল-সবুজের গর্জন, সঞ্জয়ের পারফরম্যান্সে গর্বিত বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবে বিশ্বকাপ ফুটবলের এই মহাযজ্ঞে বাংলাদেশ নেই, তবুও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে উড়েছে বাংলাদেশের গর্ব, উচ্চারিত হয়েছে লাল-সবুজের পরিচয়। আর সেই গর্বের নাম-সঞ্জয় দেব।

শ্রীমঙ্গলের মাটিতে জন্ম, চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাসে বেড়ে ওঠা আর পরে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এক সময়ের স্বপ্নবাজ সেই তরুণ আজ দাঁড়িয়ে গেলেন বিশ্বকাপের ঝলমলে মঞ্চে। কানাডায় অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক তারকাদের সঙ্গে পারফর্ম করে তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (১২ জুন) রাতে টরন্টো স্টেডিয়ামে যখন আলো-ঝলমলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়, তখন কোটি দর্শকের চোখ ছিল বিশ্বমানের শিল্পীদের দিকে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের চোখ আটকে যায় এক বিশেষ মুহূর্তে। মঞ্চে উঠেই সঞ্জয় যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন; তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তাঁর শেকড় কোথায়।

তার পোশাকের হাতায় ফুটে উঠেছিল বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। লাল-সবুজের রঙে সাজানো স্লিভ যেন বহন করছিল বাংলাদেশের পতাকার আবেগ। মঞ্চে পারফর্ম করার সময় তিনি বারবার সেই অংশটুকু ক্যামেরার সামনে তুলে ধরছিলেন। যেন বিশ্বকে বলতে চাইছিলেন, ‘আমি বাংলাদেশের সন্তান, আমি লাল-সবুজের প্রতিনিধি।’

এটি ছিল শুধু একটি সংগীত পরিবেশনা নয়; এটি ছিল নিজের দেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বার্তা।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে সঞ্জয়ের উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কারণ ফুটবল মাঠে প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও সংস্কৃতি, সংগীত ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারে, তার উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে উঠেছেন তিনি।

টরন্টোর সেই মঞ্চে সঞ্জয়ের পাশে ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীরা। কানাডিয়ান তারকা মাইকেল বুবলে, অ্যালানিস মরিসেটসহ বিশ্বসংগীতের পরিচিত মুখদের সঙ্গে একই মঞ্চে পারফর্ম করা যে কোনো শিল্পীর জন্যই গর্বের বিষয়। আর সেই গর্বের অংশীদার হলো পুরো বাংলাদেশ।

লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক এই ডিজে ও মিউজিক প্রডিউসারের যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। ছোট্ট একটি ঘরে বসে সংগীত তৈরির স্বপ্ন থেকে শুরু করে আজ বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে পৌঁছানো; এ যেন অধ্যবসায়, মেধা আর স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণার গল্প।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সঞ্জয় বলেছেন, ছোট পরিসরে সংগীত চর্চা শুরু করলেও একদিন বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে দাঁড়াবেন; এমন কল্পনাও করেননি। তাই এই সুযোগ তাঁর কাছে শুধুই একটি পারফরম্যান্স নয়, বরং স্বপ্নপূরণের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

বিশ্বকাপ এবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিন দেশে পৃথক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ফুটবল উৎসবের যাত্রা শুরু হয়েছে। সেই আয়োজনের কানাডা অধ্যায়ে বাংলাদেশের একজন শিল্পীর অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে দেশের জন্য এক বিশেষ অর্জন।

শ্রীমঙ্গলের সবুজ চা-বাগান থেকে শুরু হওয়া একটি জীবনগল্প, চট্টগ্রামের প্রাণচঞ্চল দিনগুলো পেরিয়ে কানাডার বিশ্বমঞ্চে পৌঁছেছে। সঞ্জয়ের এই অর্জন যেন নতুন প্রজন্মকে শেখায়; স্বপ্নের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। মেধা, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চেও জায়গা করে নেওয়া সম্ভব।

টরন্টোর সেই আলোকোজ্জ্বল রাতে হয়তো কোনো ফুটবল ম্যাচ শুরু হওয়ার অপেক্ষা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল অন্য কিছু। সেটি হলো; একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিল্পীর হাত ধরে বিশ্বকাপের মঞ্চে উড়েছে লাল-সবুজের পতাকা, গর্জে উঠেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রতীক, আর বিশ্বদরবারে নতুন করে উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশের নাম।

এ যেন শুধু সঞ্জয়ের অর্জন নয়; এটি ১৮ কোটি মানুষের গর্ব, একটি দেশের স্বপ্ন এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের উজ্জ্বল উপস্থিতির এক অনন্য প্রতীক।