প্রকাশিত : ১৩ জুন, ২০২৬ ২২:৩২ (রবিবার)
সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী অংশগ্রহণ নিশ্চিতে শ্রীমঙ্গলে প্রেস ব্রিফিং

ছবি: সাজু মারছিয়াং

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তথ্যভিত্তিক, নিরাপদ ও সমঅধিকারভিত্তিক নির্বাচনী অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করার চলমান সুযোগসমূহ নিশ্চিত করার সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের দাবিতে মৌলভীবাজারের  শ্রীমঙ্গলে প্রেস ব্রিফিং করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপসা।

শনিবার (১৩ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় শ্রীমঙ্গল শহরের রিজিক রেস্টুরেন্টের কনফারেন্স রুমে এ প্রেস ব্রিফিংয়ে রূপসার নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মন্ডল, কমিউনিকেশন অফিসার রবিউল শিকদার, প্রোগ্রাম অফিসার মোসাম্মৎ খাদিজা খাতুন, পোগ্রাম অফিসার পূজারিণী বিশ্বাস, অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট খাদিজা আক্তার কেয়া প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন। 

প্রেস ব্রিফিংয়ে লিখিত বক্তব্যে রূপসার নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মন্ডল বলেন, `রূপসার নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ ফলাফল অনুযায়ী দেখা যায় যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহ সাধারণভাবে বাংলাদেশে ২০২৬ সালের সংসদীয় নির্বাচন ও গণভোটে শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যবেক্ষণে দলিত, জাতিগত, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য জাতীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ, সমান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং নিরাপদ নির্বাচনী সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে চলমান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।'

তিনি বলেন, ২০২৬ সালের বাংলাদেশ নির্বাচন প্রকল্পে সিভিক রাইটস অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন অবজারভেশন উদ্যোগের অংশ হিসেবে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্বারা অর্থায়িত এবং ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি (EPD) দ্বারা সমর্থিত, রূপসা ২৫টি সংসদীয় আসনের ৫০৯টি ভোটকেন্দ্রে ২০০ জন প্রশিক্ষিত নাগরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে। এই পর্যবেক্ষণ প্রাক-নির্বাচন, নির্বাচন দিবস এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব এবং নিরাপত্তা মূল্যায়ন করেছে। 

হিরন্ময় মন্ডল বলেন, `পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশ সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল এবং প্রক্রিয়াগতভাবে সুশৃঙ্খল ছিল। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র সময়মতো খোলা হয়েছে, নির্বাচনী সামগ্রী যথাযথভাবে সরবরাহ করা হয়েছে এবং ভোটাররা উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পেরেছেন। তবে এই প্রশাসনিক সাফল্য সত্ত্বেও, ফলাফলগুলো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী অংশগ্রহণ এবং বাস্তব অর্থবহ গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে বিদ্যমান স্থায়ী ঘাটতির দিকে ইঙ্গিত করে।'
 
প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যে প্রধান উদ্বেগটি চিহ্নিত হয়েছে তা হলো গণভোট প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণের সীমিত মাত্রা, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে। 

রূপসার নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মন্ডল বলেন, `অনেক সংখ্যালঘু ভোটার জানান যে তারা ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর পরই গণভোট সম্পর্কিত বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারেন, যা ভোটার শিক্ষা ও নাগরিক সচেতনতা কার্যক্রমে চলমান ঘাটতির প্রতিফলন। পর্যবেক্ষণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্বাচনী প্রার্থিতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অব্যাহত অপ্রতিনিধিত্বও উঠে এসেছে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ৭৯ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং তাদের মধ্যে মাত্র ৪ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচিত চারজনই একই রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত ছিল-৭৯ জন সংখ্যালঘু প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০ জন নারী ছিলেন।’

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ফলাফলগুলো আরও নির্দেশ করে যে রাজনৈতিক মনোনয়নে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব উৎসাহিত করার জন্য কোনো আইনগত বা নীতিগত কাঠামোর অনুপস্থিতি সমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধ্য সৃষ্টি করছে। অনেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য ভোটার হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ সত্ত্বেও নিজেদের রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক বোধ করেছেন। 

তিনি বলেন, যদিও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, পর্যবেক্ষণে এমন কিছু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে যা ভোটারদের আস্থা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পর্যবেক্ষণকৃত প্রায় ১১.৬ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে হয়রানি, চাপ প্রয়োগ বা ভোটার চলাচলে সীমাবদ্ধতার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশে, সম্ভাব্য নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধের আশঙ্কায় স্থানীয় জনগণ রাজনৈতিক কার্যক্রমে প্রকাশ্যে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। 

হিরন্ময় মন্ডল বলেন, ‘ফলাফলগুলো বিবেচনায় নিয়ে রুপসা ইলেকশন অবজারভেশন টিম মন্তব্য করে- ২০২৬ সালের নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা অর্জন করা সম্ভব। তবে যে বিষয়টি এখনও অধরা রয়ে গেছে তা হলো প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভোট দিতে পারে, কিন্তু তারা সবসময় সমান, তথ্যভিত্তিক বা সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে ভোট দিতে পারে না। এই ব্যবধান দূর করতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের জরুরি ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

এ সময় পর্যাবেক্ষণ ফলাফলের ভিত্তিতে রূপসা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী অংশগ্রহণ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে এবং নিম্নলিখিত সুপারিশসমূহ প্রদান করে:
 
১. বহু-ভাষাভিত্তিক নাগরিক শিক্ষা, সহজপ্রাপ্য অভিযোগ ব্যবস্থা এবং সংখ্যালঘু ভাষায় নির্বাচনী উপকরণ অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত সংখ্যালঘু অন্তর্ভুক্তি কৌশল প্রণয়ন, 
২. মোবাইল ভোটার নিবন্ধন সেবা সম্প্রসারণ এবং ভৌগোলিকভাবে প্রান্তিক এলাকায়, যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চা বাগান এলাকায়, ভোটকেন্দ্রের প্রবেশগম্যতা উন্নত করা, 
৩. তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভোটার শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা,
৪. রাজনৈতিক দলগুলোকে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে নারী, দলিত ও জাতিগত সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মনোনয়ন বৃদ্ধিতে স্বেচ্ছা অঙ্গীকার গ্রহণে উৎসাহিত করা,
৫. ভোটার আস্থা ও নির্বাচনী জবাবদিহিতা শক্তিশালী করতে সময়মতো, গোপনীয় ও সহজপ্রাপ্য অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা,
৬. নির্বাচন-পরবর্তী টেকসই সংলাপ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং দীর্ঘমেয়াদী নাগরিক সম্পৃক্ততা উন্নয়ন কর। 

রূপসা পুনর্ব্যক্ত করে, এই পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে। সংগঠনটি জোর দিয়ে বলে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ জোরদার করা বাংলাদেশের সমান নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

রূপসা (গ্রামীণ ও নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক উন্নয়নের অংশীদার) বাংলাদেশে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শাসন, নাগরিক সম্পক্ততা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিযে কাজ করা একটি অধিকারভিত্তিক নাগরিক সমাজ সংগঠন। এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসির AHEAD প্রকল্পের অধীনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপসা কর্তৃক আয়োজিত এ প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান, সিনিয়র সাংবাদিক ইসমাইল মাহমুদ, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার প্রতিনিধি শিমুল তরফদার, দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকার মাল্টিমিডিয়া প্রতিনিধি মো. আলামিন, সাপ্তাহিক দুর্বার সংবাদ পত্রিকার প্রতিনিধি নীরনেপুর তুলসী প্রসাদ সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।