প্রকাশিত : ১৪ জুন, ২০২৬ ২০:২৪ (সোমবার)
মাগুরছড়া বিস্ফোরণের ২৯ বছর: মেলেনি ক্ষতিপূরণ, ফিরেনি জীববৈচিত্র্য

ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মৌলভীবাজারের মাগুরছড়া গ্যাসকূপে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণের ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এর ক্ষতচিহ্ন এখনো বহন করছে লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, দীর্ঘ এই সময়েও বনাঞ্চলের ক্ষতিপূরণ আদায় কিংবা পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

১৯৯৭ সালের এই দিনে মার্কিন তেল-গ্যাস কোম্পানি অক্সিডেন্টাল পেট্রোলিয়াম মাগুরছড়া গ্যাসকূপে খননকাজ চালানোর সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু আগুনের শিখায় পুড়ে যায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রায় সাড়ে ৮৭ একর বনাঞ্চল।

বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঢাকা-সিলেট রেলপথ, শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়ক, ফুলবাড়ি চা বাগান, খাসিয়া পানপুঞ্জি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সরকারি তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় প্রায় ২৪৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়েছিল।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তদন্তে দুর্ঘটনার জন্য অক্সিডেন্টাল কোম্পানির অবহেলাকে দায়ী করা হয়। অন্যদিকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ৬০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও আজ পর্যন্ত সেই অর্থ আদায় হয়নি।

তবে বর্তমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান শেভরন বাংলাদেশ-এর মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস ম্যানেজার শেখ জহিরুল রহমান দাবি করেন, মাগুরছড়া ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রমাণিত ক্ষতিপূরণ দাবি ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি সরকার ও পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সব দায়িত্ব পালন করছে।

এই দাবির সঙ্গে একমত নন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা। তারা ক্ষতিপূরণ আদায় এবং কমলগঞ্জ উপজেলায় গ্যাস সংযোগ দেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

হিল প্রোটেকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, কমলগঞ্জ ইউনিটের সভাপতি মোনায়েম খান বলেন, মাগুরছড়া বিস্ফোরণের ক্ষতিপূরণ, স্থানীয় জনগণের জন্য গ্যাস সংযোগসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিস্ফোরণের আগুনে শুধু বনাঞ্চল নয়, জীববৈচিত্র্যেরও অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বহু বিরল গাছপালা, সরীসৃপ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী তাদের আবাসস্থল হারিয়েছে। অনেক পাখি পাশের কালাছড়া বনে চলে গেছে।

লাউয়াছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা ও খাসিয়া সোশ্যাল কাউন্সিলের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং বলেন, ২৯ বছর পরও সেই বিস্ফোরণের স্মৃতি স্থানীয় খাসিয়া সম্প্রদায়ের মনে আতঙ্ক জাগায়। বন বিভাগ পুনরায় বনায়ন করলেও প্রকৃতির ক্ষত পুরোপুরি মুছে যায়নি।

বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক সমিতির মৌলভীবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল মোহাইমিন মিল্টন বলেন, বিস্ফোরণে লাউয়াছড়ার মূল্যবান সেগুন, বাঁশসহ বহু প্রজাতির গাছ এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়ে তার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজের পরিচালক ও গবেষক পাভেল পার্থ জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর লাউয়াছড়া থেকে বেশ কিছু বিরল উদ্ভিদ, লতাগুল্ম, পাখি ও সরীসৃপ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আগে বনের ভেতরে প্রচুর ফার্ন, ফাঙ্গাস, অ্যালগি এবং ‘নিতম’ নামের জিমনোস্পার্ম দেখা গেলেও এখন সেগুলোর উপস্থিতি খুবই কম।

তিনি বলেন, অন্ধকারে আলো ছড়ানো বিরল ছত্রাক ‘লুমিনা ফাঞ্জাই’ এবং ত্রিপুরা ভাষায় ‘কুতুই রুগনি ক্লুম’ নামে পরিচিত সাদা ফুলের গাছটিও এখন আর দেখা যায় না। অনেক পাখি লাউয়াছড়া ছেড়ে কালাছড়া বনে নতুন আবাস গড়ে তুলেছে।

পরিবেশবিদদের মতে, মাগুরছড়া বিস্ফোরণ শুধু একটি শিল্প দুর্ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয়। ২৯ বছর পরও যার প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি লাউয়াছড়া।