প্রকাশিত : ১৬ জুন, ২০২৬ ২০:৪৩ (বুধবার)
এস আলমের বৈশ্বিক সম্পদে তদন্তের জাল: এবার নজরে কুয়ালালামপুরে

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম)-এর চারপাশের আইনি বেড়াজাল ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। সাইপ্রাসে তার সম্পত্তি ক্রোক ও সিঙ্গাপুরে সম্পদ অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় এবার নজর পড়েছে কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুটি নামী হোটেলের ওপর। সম্প্রতি এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সংবাদপত্র দ্য এজ মালয়েশিয়া।

চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এস আলমের বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ভিত্তি অর্থপাচারের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ এমনই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মে মাসে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সাইপ্রাসে তার ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল আবাসিক সম্পত্তি ক্রোক করা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশের একটি আদালত তার অনুপস্থিতিতে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের সম্পদের ওপর অনুসন্ধান চালাচ্ছে দেশটির তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

কুয়ালালামপুরের প্রাণকেন্দ্র জালান সুলতান ইসমাইল ও জালান আমপাংয়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত ‘রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার’ এবং ‘ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার’ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

একই জমির ওপর নির্মিত এই দুটি হোটেলের মালিকানা রয়েছে ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনাল এসডিএন বিএইচডি’র হাতে, যা এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। ২০১৬ সালে তৎকালীন আইজিবি কর্পোরেশন ৭৬৫ মিলিয়ন রিঙ্গিতে হোটেলটি ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনালের কাছে বিক্রি করে।

ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনালের মালিকানা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একাধিক মালয়েশিয়ান ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক হোল্ডিং কোম্পানির নাম। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া, ওয়াইআইএফ হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিটেড এবং হিলড্রিক্স এশিয়া গ্রোথ ফান্ড।

ব্যবসায়িক নথিপত্রে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিলড্রিক্স ক্যাপিটালের সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি মালয়েশিয়ার জিআইআইবি হোল্ডিংস এবং সিঙ্গাপুরের এমএম২ এশিয়াসহ বেশ কয়েকটি আলোচিত প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে।

মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত হোটেল দুটির বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। তবে আন্তর্জাতিক তদন্তের বিস্তৃতি এবং বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক সম্পদ উদ্ধারের প্রচেষ্টার কারণে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ায় থাকা এস আলম-সংশ্লিষ্ট সম্পদও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। আগামী ২১ ও ২২ জুন কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিতব্য সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, অভিবাসন, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিক্ষা সহযোগিতা হবে আলোচনার প্রধান বিষয়।
সফরের অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা। আধুনিক দাসত্ব, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার অভিযোগে ২০২৪ সাল থেকে বাজারটি বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার এবার ১০২টি নয়, ৪৩২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অন্তর্ভুক্ত করে আরও উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, মালয়েশিয়ায় এস আলমের সম্পদের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশি শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ দুই বিষয়ই এখন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।

আসন্ন দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অর্থপাচার, সম্পদ পুনরুদ্ধার কিংবা শ্রমবাজার সংস্কার কতটা গুরুত্ব পাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু স্পষ্ট, কুয়ালালামপুরের দুই বিলাসবহুল হোটেল এবং বাংলাদেশি শ্রমবাজার দুই ইস্যুই এখন আঞ্চলিক কূটনীতি ও অর্থনৈতিক আলোচনার নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।