ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতিহাস কখনো কখনো ছায়ার মতো পিছু নেয়। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও সেটাই ছিল বাস্তবতা। শিরোপাজয়ী দল হিসেবে পরবর্তী বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হোঁচট খাওয়ার তিক্ত স্মৃতি বারবার ফিরে এসেছে তাদের কাছে। কিন্তু কানসাস সিটির রাত যেন সেই পুরোনো গল্প নতুন করে লিখতে নেমেছিল এক মানুষের পায়ে; লিওনেল মেসি।
ম্যাচের শুরু থেকেই যেন পুরো স্টেডিয়াম অপেক্ষা করছিল সেই পরিচিত বাঁ পায়ের জাদুর জন্য। মাত্র পাঁচ মিনিটেই বল জালে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মেসি। গ্যালারিতে নীল-সাদা উল্লাসের ঢেউ বয়ে যায়। কিন্তু প্রযুক্তির যুগে আনন্দেরও পরীক্ষা আছে। সহকারী রেফারির পতাকা উঠতেই উল্লাস থেমে যায়। রিপ্লেতে দেখা যায়, অতি সামান্য ব্যবধানে অফসাইড ছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ইতিহাসের মুহূর্তটিকে তখনো অপেক্ষা করতে হলো।
কিছুক্ষণ পর একই ভাগ্যের শিকার হয় আলজেরিয়াও। তাদের জালে বল পাঠানোর আনন্দও অফসাইডের ফাঁদে আটকে যায়। যেন ম্যাচটি ঘোষণা দিচ্ছিল; আজকের রাতের গল্প অন্যভাবে লেখা হবে।
আর সেই গল্পের লেখক যে মেসিই, তা বুঝতে সময় লাগেনি।
১৬ মিনিটে মিডফিল্ড থেকে রদ্রিগো ডি পলের পাস পেয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। সামনে কয়েক গজ এগিয়ে গিয়ে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেন এক দুর্দান্ত শট। বলটি বাতাস চিরে এমন গতিতে এগিয়ে যায় যে আলজেরিয়ার গোলরক্ষক, কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ছেলে লুকা জিদানের ছোঁয়াও তাকে থামাতে পারেনি। মুহূর্তেই জাল কাঁপে, আর স্টেডিয়ামজুড়ে বিস্ফোরিত হয় উল্লাস।
এটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির ১৪তম গোল, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১১৮তম গোল। একই সঙ্গে কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার বার্তা। তবে সংখ্যার চেয়েও বড় ছিল গোলটির সৌন্দর্য। এটি ছিল একজন শিল্পীর তুলির শেষ আঁচড়ের মতো নিখুঁত, একজন কবির শেষ পঙ্ক্তির মতো মুগ্ধকর।
দিনটিকে আরও বিশেষ করে তুলেছে আরেকটি পরিসংখ্যান। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটি মেসির ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ফুটবল ইতিহাসে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও বাদের আল-মুতওয়ার পর তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে এই মাইলফলক স্পর্শ করলেন তিনি। আর বিশ্বকাপে দেশের হয়ে ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতায় তিনিই প্রথম।
রেকর্ডের রাত, ইতিহাসের রাত, আর মেসির রাত; সবকিছু যেন এক সুতোয় গাঁথা। ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা প্রথম ফুটবলার হিসেবে নতুন অধ্যায়ে পা রাখা এই কিংবদন্তি শুধু গোলই করেননি, বদলে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার বহুদিনের এক অস্বস্তিকর ইতিহাসের গতিপথও।
যে ইতিহাস বলত, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা হোঁচট খায়; মেসি সেই ইতিহাসের চোখে চোখ রেখে উত্তর দিয়েছেন। ডিফেন্স চেরা পাস, মাঠজুড়ে নেতৃত্ব আর দূরপাল্লার অবিশ্বাস্য শটে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন; চ্যাম্পিয়নরা শুধু ট্রফি জেতে না, কঠিন সময় এলে নিজেদের পরিচয়ও নতুন করে প্রতিষ্ঠা করে।
আর সেই পরিচয়ের নাম; লিওনেল মেসি।