প্রকাশিত : ১৭ জুন, ২০২৬ ০৯:০৮ (বুধবার)
ইতিহাসের চোখে চোখ রেখে মেসির উত্তর, কানসাস সিটির রাতে এক মহাকাব্যের জন্ম

ছবি: সংগৃহীত

কাতার বিশ্বকাপের শেষ দৃশ্যে যে মানুষটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন, নতুন বিশ্বকাপের প্রথম অধ্যায়েও তিনিই কলম ধরলেন। চার বছর আগের সেই সোনালি রাতের পর সময় বদলেছে, মঞ্চ বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি লিওনেল মেসির জাদু। কানসাস সিটির আকাশের নিচে তিনি যেন আবারও মনে করিয়ে দিলেন; কিংবদন্তিরা বয়সে বৃদ্ধ হন, ফুটবলে নয়।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে একাই তিনটি গোল করলেন মেসি। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিকের রাতে তিনি ছুঁয়ে ফেললেন মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ডও। আর মাত্র একটি গোল; তারপর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে এককভাবে বসবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।

তবে সংখ্যার গল্পের চেয়েও বড় ছিল রাতটির সৌন্দর্য।

খেলার পাঁচ মিনিটেই স্টেডিয়াম যেন উল্লাসে বিস্ফোরিত হয়েছিল। বল জালে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মেসি। গ্যালারিতে নীল-সাদা আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রযুক্তির নির্মম নির্ভুলতা সেই আনন্দকে মুহূর্তেই থামিয়ে দেয়। সহকারী রেফারির পতাকা উঠে যায় আকাশে। রিপ্লেতে দেখা যায়, অতি সামান্য ব্যবধানে অফসাইড ছিলেন তিনি।

মুহূর্তটি যেন বলছিল, আজকের রাতের গল্প আরও ধীরে, আরও যত্ন করে লেখা হবে।

কিছুক্ষণ পর আলজেরিয়াও একই ভাগ্যের শিকার হয়। তাদের একটি গোলও বাতিল হয় অফসাইডের কারণে। যেন দুই দলকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল; আজকের রাতের নায়ক একজনই।

১৬ মিনিটে সেই নায়ক নিজের পরিচয় দিলেন।

মিডফিল্ড থেকে রদ্রিগো ডি পলের নিখুঁত পাস পেয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেন মেসি। সামনে কয়েক গজ এগিয়ে গিয়ে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ের এক বজ্রগতির শট নেন। বলটি বাতাস কেটে এমনভাবে গোলপোস্টের দিকে ছুটে যায়, যেন দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত কোনো কবিতা শেষ লাইনে পৌঁছাতে চাইছে। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু স্পর্শও করতে পারেননি।

জাল কাঁপে।

স্টেডিয়াম কাঁপে।

আর ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে আবারও জন্ম নেয় বিস্ময়।

এটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির ১৪তম গোল এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১১৮তম গোল। কিন্তু গোলটির সৌন্দর্য কোনো পরিসংখ্যানের মধ্যে বন্দী করা যায় না। সেটি ছিল যেন এক শিল্পীর তুলির শেষ আঁচড়, একজন সুরকারের নিখুঁত সমাপ্তি সুর।

দ্বিতীয়ার্ধে আলজেরিয়ার প্রতিরোধ আরও ভেঙে দেন মেসি। ৬০ মিনিটে গোলরক্ষক লুকা জিদানের ভুলের সুযোগ নিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। আর ৭৬ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত।

ডি-বক্সের ভেতরে বল পেয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের অসহায় করে জালে বল জড়িয়ে দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। মুহূর্তেই পূর্ণ হয় হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবারের মতো তিন গোলের আনন্দে ভাসেন মেসি।

কিন্তু এই রাত শুধু হ্যাটট্রিকের ছিল না।

এটি ছিল মাইলফলকের রাতও।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটি ছিল মেসির ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ফুটবল ইতিহাসে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও বাদের আল-মুতওয়ার পর তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে এই বিরল অর্জনের মালিক হলেন তিনি। ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা প্রথম ফুটবলার হিসেবে আরও একটি অনন্য অধ্যায়ও যুক্ত হলো তাঁর নামের পাশে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই জয় বদলে দিয়েছে আর্জেন্টিনার একটি পুরোনো মানসিক বোঝা। ইতিহাস বলত, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা প্রায়ই হোঁচট খায়। সেই অস্বস্তিকর স্মৃতি বহু বছর ধরে তাড়া করে ফিরেছে আলবিসেলেস্তেদের।

কিন্তু কানসাস সিটির এই রাতে ইতিহাসের চোখে চোখ রেখে উত্তর দিয়েছেন মেসি।

তিনি শুধু তিনটি গোল করেননি; তিনি প্রমাণ করেছেন ক্ষুধা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পরও নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস তাঁর আছে। মাঠজুড়ে নেতৃত্ব, ডিফেন্স চেরা পাস আর জাদুকরী ফিনিশিংয়ে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন; চ্যাম্পিয়নরা শুধু ট্রফি জেতে না, প্রয়োজন হলে নিজেদের পরিচয়ও নতুন করে প্রতিষ্ঠা করে।

রাতটি ছিল রেকর্ডের।

রাতটি ছিল ইতিহাসের।

সবচেয়ে বেশি, রাতটি ছিল একজন মানুষের।

যার নাম লিওনেল মেসি।