ছবি: সংগৃহীত
জৈন্তেশ্বর বাড়ি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত জাতীয় ঐতিহ্য। আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহার বা সেখানে কোনো কার্যক্রম পরিচালনার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। কোনো মেলা বা অন্য কার্যক্রমের নামে যদি এই ঐতিহ্যের ক্ষতি হয়, তবে তা শুধু দায়িত্বহীনতাই নয়, সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ সুরক্ষার আইনি চেতনারও পরিপন্থী।
জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের উচিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমোদন ও নির্দেশনা ব্যতীত এমন কোনো কার্যক্রমের অনুমতি না দেওয়া, যা আমাদের অমূল্য ঐতিহ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। উন্নয়ন বা উৎসব হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস ধ্বংসের বিনিময়য়ে নয়।
একজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে উপেক্ষা করে বা এড়িয়ে গিয়ে কোনো বেসরকারি সংস্থাকে সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী স্থানে মেলা বা উৎসব করার অনুমতি দিতে পারেন না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডিসি সাহেবের অনুমোদন নিয়ে এই মেলা আয়োজিত হচ্ছে মর্মে তথ্য প্রবাহিত হচ্ছে। যদি তাই হয় তবে বিষয়টি উদ্বেগের ও হতাশার।
পুরাকীর্তি আইন, ১৯৬৮ (Antiquities Act, 1968) অনুযায়ী, সরকারিভাবে ঘোষিত যেকোনো সংরক্ষিত পুরাকীর্তি বা ঐতিহ্যবাহী স্থানের চূড়ান্ত তত্ত্বাবধায়ক ও আইনি অভিভাবক হলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
১. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একক ও চূড়ান্ত ক্ষমতাআইনি অভিভাবক: এই আইনের ১০ এবং ১২ ধারা অনুযায়ী, সংরক্ষিত পুরাকীর্তির রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং হেফাজতের সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের।ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা: আইনের ১৮ ধারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, কোনো সংরক্ষিত স্থাবর পুরাকীর্তি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো অনুষ্ঠান বা মেলা পুরাকীর্তির জন্য ক্ষতিকর কি না, তা নির্ধারণ করার একক ক্ষমতা কেবল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের।
২. জেলা প্রশাসকের (ডিসি) ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাপ্রশাসনিক বনাম সংবিধিবদ্ধ ক্ষমতা: জেলা প্রশাসক একটি জেলার প্রধান প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ হলেও, তিনি সংসদ কর্তৃক পাস হওয়া একটি নির্দিষ্ট বিশেষ আইনকে (Statutory Act) লঙ্ঘন বা অকার্যকর করতে পারেন না। আইনে কোনো বিশেষ ক্ষমতা নেই: পুরাকীর্তি আইনে স্থানীয় সিভিল প্রশাসন বা ডিসিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের লিখিত অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে কোনো বাণিজ্যিক, সামাজিক বা বেসরকারি সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
৩. নিয়ম লঙ্ঘন করে অনুমতি দেওয়ার আইনি পরিণতি ফৌজদারি অপরাধ: আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী, যদি কেউ কোনো সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ধ্বংস, ক্ষতিসাধন, পরিবর্তন বা অপব্যবহার করে, তবে তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।অবৈধ আদেশ: যদি কোনো ডিসি অফিস প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে উপেক্ষা করে এমন কোনো অনুমতিপত্র জারি করে, তবে সেই প্রশাসনিক আদেশটি আইনিভাবে অবৈধ বলে গণ্য হবে। এটিকে যেকোনো সময় হাইকোর্টে রিট পিটিশনের (Writ Petition) মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। যেকোনো বেসরকারি সংস্থা যদি কোনো সংরক্ষিত স্থান বা তার বাফার জোনের (আশপাশের এলাকা) মধ্যে কোনো অনুষ্ঠান করতে চায়, তবে জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে অনুমতি নেওয়ার পূর্বে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে বাধ্যতামূলকভাবে একটি অনাপত্তি পত্র (NOC) সংগ্রহ করতে হবে।
[লিখাটি ফেসবুক থেকে নেওয়া]