প্রকাশিত : ২১ জুন, ২০২৬ ১৯:৪৯ (সোমবার)
‘ইলিয়াস আলীকে গুমের কথা নিজেই স্বীকার করেছিলেন জিয়াউল আহসান’- ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য

ছবি: ইলিয়াস আলী।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছেন তার সাবেক বডিগার্ড বা রানার সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। জবানবন্দিতে তিনি বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীকে গুমের ঘটনায় জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ধরেন এবং নিজের নিরাপত্তাও দাবি করেন।

রোববার বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলার পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে ইমরুল কায়েসের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এ সময় অভিযুক্ত জিয়াউল আহসান ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে ইমরুল কায়েস রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে জিয়াউল আহসান, মেজর নওশাদ ও অন্যদের সঙ্গে তিনি মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যান। সেখানে কোনো একটি ‘টার্গেট’-এর জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছিল। তবে ওই ব্যক্তি সেদিন আসেননি। পরদিন ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি জানতে পারেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হয়েছেন।

তিনি আরও জানান, ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে এসে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করেন। একদিন জিয়াউল আহসানকে ফোনে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর সঙ্গে কথা বলতে শুনেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

সাক্ষীর ভাষ্যমতে, ফোনালাপের একপর্যায়ে জিয়াউল আহসান বলেন, ‘আপনাদের কথামতো ইলিয়াস আলীকে গুম করলাম। এখন আপনারা এরকম করলে হবে? আমি কমান্ডো মানুষ। তাহলে পোস্টিং দিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দেন।’

ইমরুল কায়েস আরও দাবি করেন, ইলিয়াস আলীকে গুমের পর র‌্যাব সদর দপ্তরের কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ ধ্বংস করে ফেলা হয়। তিনি বলেন, প্রায় এক বছর তিন-চার মাস জিয়াউল আহসানের বডিগার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বহু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন।

জবানবন্দির একপর্যায়ে নিজের নিরাপত্তার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, এখন আমি নিরাপত্তা চাই।’

শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, তদন্ত ও সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর অপহরণে জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তিনি দাবি করেন, জিয়াউল আহসানের একটি বিস্তৃত ‘কিলিং নেটওয়ার্ক’ ছিল, যা বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় ছিল। সাক্ষীর জবানবন্দিতে জাফলং এলাকায় পরিচালিত একটি অভিযানের কথাও উঠে এসেছে, যেখানে কয়েকজন ব্যক্তিকে সীমান্ত এলাকায় বিনিময়ের মাধ্যমে হস্তান্তরের পর হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে আটক কিছু সদস্যকে ইনজেকশন প্রয়োগ কিংবা গুলি করে হত্যার অভিযোগও সাক্ষ্যতে উঠে এসেছে।

উল্লেখ্য, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গাজীপুর, বরগুনা ও সুন্দরবন এলাকায় একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলার পরবর্তী কার্যক্রম ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে।