প্রকাশিত : ২১ জুন, ২০২৬ ২২:৩১ (সোমবার)
ভানুগাছ স্টেশনে জনবল সংকট, দুর্ভোগে যাত্রীরা

ছবি: স্বপন কুমার সিং।

মৌলভীবাজার জেলার ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ জন যাত্রী এই স্টেশন ব্যবহার করলেও প্রয়োজনীয় সেবা ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।

স্টেশনের দায়িত্বে রয়েছেন স্টেশন মাস্টার গৌর প্রসাদ দাস ও সহকারী স্টেশন মাস্টার নিপেন্দ্র সিংহ। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বুকিং মাস্টারের পদ শূন্য থাকায় বিদ্যমান জনবলের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

স্টেশন মাস্টার গৌর প্রসাদ দাস জানান, যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে প্ল্যাটফর্মে কমপক্ষে সাতটি ফ্যান প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি ফ্যান সচল রয়েছে বাকিগুলো নষ্ট হয়ে অকেজো হয়ে গেছে । এতে গরমের সময় যাত্রীদের চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।

স্টেশনে বর্তমানে চারজন পয়েন্সম্যান দায়িত্ব পালন করছেন। তারা হলেন রাজেশ কৈরী, সাহাদাত হোসেন, আজিম উদ্দিন ও মতিয়ার রহমান। তবে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অত্যন্ত অপ্রতুল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পরিদর্শনে দেখা গেছে, কর্মরত অবস্থায় স্টেশন মাস্টারসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক কর্মীর অফিসিয়াল ইউনিফর্ম ও নেমব্যাজ দৃশ্যমান ছিল না। ফলে যাত্রীরা প্রয়োজনীয় সেবা নিতে এসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে শনাক্ত করতে বিড়ম্বনায় পড়েন।

রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের জন্য একটি ভিআইপি ওয়েটিং রুম থাকে। তবে ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বিভিন্ন সময় আগত ভিআইপি ব্যক্তিদের স্টেশন মাস্টারের কক্ষেই বসতে হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন থেকে বালিগাঁও গ্রাম ও কুমারপাড়া এলাকায় যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিং গেটে কোনো গেটম্যান নেই। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। কোনো স্থায়ী নিরাপত্তারক্ষী না থাকায় স্টেশন এলাকায় মাদকাসক্ত, ছিনতাইকারী ও সন্দেহজনক ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়েছে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন। এমনকি স্টেশনের ছাদেও অবাধে লোকজন ঘোরাফেরা করছে।

রেল নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হলে শ্রীমঙ্গল জিআরপি (রেলওয়ে পুলিশ) স্টেশন থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায়। তবে স্টেশনে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব স্পষ্ট।

যাত্রীসেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সংকট। বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, টয়লেট ও ওয়াশরুমের মান নিম্নমানের এবং পরিচ্ছন্নতারও অভাব রয়েছে।

স্টেশনের রেললাইনের পাশে ময়লা-আবর্জনা জমে পরিবেশ দূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি রেলওয়ে টার্মিনাল এলাকায় ট্রাক, পিকআপ, সিএনজি ও ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখায় যানজট ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে, ভানুগাছ বাজার থেকে রেলস্টেশনের দিকে যাওয়ার সড়কে অবৈধ টমটম ও অটোরিকশার দৌরাত্ম্যের কারণে যাত্রী ও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়ছেন।

এদিকে সিলেট, কুলাউড়া ও শায়েস্তাগঞ্জের মতো রেলওয়ে জংশন স্টেশনগুলোতে কর্মীদের জন্য ডিসপেনসারি ও ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের কর্মীরা সরাসরি সেই সুবিধার আওতায় নেই।

এ বিষয়ে সহকারী স্টেশন মাস্টার নিপেন্দ্র সিংহ বলেন, ‘সব স্টেশন এই সুবিধার আওতায় পড়ে না। আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী কুলাউড়া থেকে ওষুধ সংগ্রহ করি। এভাবেই বিভিন্ন স্টেশনের কর্মীদের প্রয়োজনীয় কাভারেজ দেওয়া হয়।’

অন্যদিকে, শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চুরি, ছিনতাই, টিকিটের কালোবাজারি, মাদক নির্মূল, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ রোধ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। কোনো সমস্যা দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে আমাদের টিম সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে থাকে।

দীর্ঘদিনের এসব সমস্যা সমাধানে ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনে জনবল বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার এবং যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাত্রীরা।