ছবি: সংগৃহীত
ফুটবল মাঠে হলুদ জার্সি, সবুজ বর্ডার, নীল হাফপ্যান্ট আর সাদা মোজা দেখলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পেলের জাদুকরী ফুটবল, সাম্বা নাচের ছন্দ আর ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক খেলার সৌন্দর্য। বিশ্বজুড়ে এই হলুদ জার্সি শুধু একটি দলের পোশাক নয়, বরং ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আনন্দ, আবেগ ও সৌন্দর্যের প্রতীক।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো একবার বলেছিলেন, ‘আমাদের কাছে এই হলুদ জার্সিটি পবিত্র। এটি গায়ে দিলে যেমন গর্ব অনুভব করি, তেমনি ভালো খেলার দায়িত্বও অনেক বেড়ে যায়।’
তবে আজকের এই কিংবদন্তি জার্সির পেছনে রয়েছে এক বেদনাময় ইতিহাস। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে নতুন নির্মিত মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে উরুগুয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায় স্বাগতিক ব্রাজিল। সেই পরাজয় পুরো দেশকে শোকাহত করে তোলে।
তখন ব্রাজিল দলের জার্সি ছিল সাদা রঙের, যার কলারে ছিল নীলের ছোঁয়া। উরুগুয়ের কাছে হারের পর অনেকেই সেই সাদা জার্সিকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করেন। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, জাতীয় দলের জন্য নতুন জার্সি তৈরি করা হবে, যাতে দেশের পতাকার চারটি রঙ- হলুদ, সবুজ, নীল ও সাদা- প্রতিফলিত হবে।
১৯৫৩ সালে একটি ব্রাজিলীয় সংবাদপত্র নতুন জার্সির নকশা আহ্বান করে। সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন উরুগুয়ে সীমান্তের একটি ছোট শহরের ১৮ বছর বয়সী তরুণ আলদির গার্সিয়া শ্লি। তিনি প্রায় ১০০টিরও বেশি নকশা তৈরি করেন। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি এমন একটি ডিজাইন চূড়ান্ত করেন, যেখানে ছিল হলুদ জার্সি, সবুজ কলার, নীল হাফপ্যান্ট এবং সাদা মোজা।
৪০০টিরও বেশি জমা পড়া নকশার মধ্যে বিচারকদের মন জয় করে নেয় শ্লির এই সাদামাটা কিন্তু দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন। ১৯৫৪ সালে প্রথমবারের মতো এই নতুন জার্সি পরে মাঠে নামে ব্রাজিল এবং জয়ও পায়।
মজার বিষয় হলো, ব্রাজিল এই হলুদ জার্সি পরে প্রথম বিশ্বকাপ জেতে ১৯৬২ সালে। কিন্তু তখন সারা বিশ্বে সাদা-কালো টেলিভিশনের যুগ চলছিল। ফলে বিশ্বের মানুষ জার্সিটির প্রকৃত সৌন্দর্য দেখতে পারেনি।
অবশেষে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ প্রথমবারের মতো রঙিন সম্প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হয়। কোটি কোটি দর্শক তখন দেখেছিল পেলে ও তার সতীর্থদের হলুদ জার্সি গায়ে দুর্দান্ত ফুটবল প্রদর্শন। সেই থেকেই ব্রাজিলের হলুদ জার্সি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিচিত ও জনপ্রিয় প্রতীকে পরিণত হয়।
ব্রাজিলকে রেকর্ড পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের পথে সঙ্গ দেওয়া এই বিখ্যাত জার্সির স্রষ্টা আলদির গার্সিয়া শ্লি সারাজীবন খুব সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। পরে বড় বড় ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান এই জার্সিকে ঘিরে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা গড়ে তুললেও তিনি তেমন কোনো আর্থিক সুবিধা পাননি।
জীবনের শেষ দিকে এসে শ্লি কিছুটা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমি এমন একটি জিনিস তৈরি করেছিলাম, যা একসময় আবেগের প্রতীক ছিল। এখন সেটি অনেকটাই ব্যবসার অংশ হয়ে গেছে।”
তবুও ফুটবলপ্রেমীরা তাকে কখনো ভুলবেন না। কারণ তার হাত ধরেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয়, সবচেয়ে পরিচিত এবং অনেকের কাছে ‘পবিত্র’ বলে বিবেচিত সেই বিখ্যাত হলুদ জার্সি।