প্রকাশিত : ২৫ জুন, ২০২৬ ২১:৫৮ (শুক্রবার)
হবিগঞ্জে জাতীয় ফল মেলা: চাষ, পুষ্টি সচেতনতা ও উদ্যোক্তা তৈরির প্রত্যয়

ছবি: স্বপন কুমার সিং।

‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ; কৃষিই সমৃদ্ধি। করবো মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করবো বারো মাস’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে হবিগঞ্জে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী জাতীয় ফল মেলা-২০২৬।

মেলায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা, ফলচাষি এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদিত দেশীয় ও অপ্রচলিত ফল, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও কৃষিভিত্তিক সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরছে। প্রদর্শনী স্টল, ডিসপ্লে, তথ্যসেবা, প্রচার-প্রচারণা, আলোচনা সভা এবং বিনামূল্যে চারা বিতরণ কর্মসূচির মাধ্যমে দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।

গেলো বুধবার (২৪ জুন) সকাল ১১টায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, হবিগঞ্জের আয়োজনে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে মেলার শুভ উদ্বোধন করেন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ, যা আগামী শুক্রবার (২৬ জুন) পর্যন্ত চলবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষিবিদ মো. আক্তারুজ্জামান, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, হবিগঞ্জ।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক, জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, হবিগঞ্জ। তিনি ২৪ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত আয়োজিত এই ফল মেলায় অংশগ্রহণকারী কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা, দর্শনার্থী, সাংবাদিক ও অতিথিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে বলেন, হাওর অঞ্চলের কৃষিকে আরও সমৃদ্ধ, আধুনিক ও টেকসই করতে সরকারি কর্মকর্তা, কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

তিনি আরও বলেন, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং একটি টেকসই লো-কার্বন অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সভাপতির বক্তব্যে কৃষিবিদ মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, জাতীয় ফল মেলা শুধু দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার আয়োজন নয়, বরং নতুন প্রজন্মের কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। তরুণদের কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজন আরও বেশি সহায়তা, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও উন্নত বাজারব্যবস্থা। তিনি এ বিষয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এ কে এম মাকসুদুল আলম।

মেলায় ২০ জন কৃষকের মাঝে মোট ১০০টি আম, কাঁঠাল, তাল, লিচু ও আমড়ার চারা, বাঁশের খুঁটি এবং জৈবসার বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান), জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, কৃষি উদ্যোক্তা, কৃষক, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী উপস্থিত ছিলেন।

এবারের মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার প্রদর্শন। মেলায় আগত দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষভাবে প্রদর্শন করা হয় রিফ্র্যাক্টোমিটার, যা ফলের মিষ্টতা (চিনির ঘনত্ব) ও পরিপক্বতা নির্ণয়ের একটি আধুনিক যন্ত্র।

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মঞ্জুরুল আরেফিন সবুজ স্টলে উপস্থিত থেকে দর্শনার্থীদের সামনে রিফ্র্যাক্টোমিটারের ব্যবহারিক প্রদর্শন করেন। তিনি দেখান কীভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফলের গুণগত মান, মিষ্টতার মাত্রা এবং বাজারজাতকরণের উপযোগিতা নির্ণয় করা যায়।

দর্শনার্থীরা এ প্রদর্শনীতে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা লাভ করেন। কৃষি কর্মকর্তারা মনে করেন, এ ধরনের প্রযুক্তি কৃষকদের উৎপাদনের মান উন্নয়ন, বাজার প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ফল উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টি সচেতনতা সৃষ্টি, পরিবেশ সংরক্ষণ, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং তরুণ প্রজন্মকে কৃষিতে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিন দিনব্যাপী এই জাতীয় ফল মেলা-২০২৬ হবিগঞ্জের কৃষি, পুষ্টি, পরিবেশ, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।