প্রকাশিত : ৩০ জুন, ২০২৬ ০১:১৮ (মঙ্গলবার)
সবুজ গালিচায় সাম্বার তুলির আঁচড়, শেষ হাসি ব্রাজিলের

ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল কখনো শুধু গোলের খেলা নয়। কখনো এটি অপেক্ষার, বিশ্বাসের, আবার কখনো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হার না মানার এক মহাকাব্য। হিউস্টনের সবুজ গালিচায় জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিল যেন সেই মহাকাব্যই লিখল। শুরুতে হোঁচট খেলেও শেষ বাঁশি বাজার আগে তারা এঁকে দিল প্রত্যাবর্তনের এক অনিন্দ্য সুন্দর ছবি। ৯৬ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির জয়সূচক গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে নিশ্চিত করল শেষ ষোলোর টিকিট।

ম্যাচের শুরু থেকেই বল যেন ব্রাজিলের পায়ের প্রেমে পড়ে ছিল। ছোট ছোট পাস, নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ আর আক্রমণের পর আক্রমণে জাপানের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখেছিল সেলেসাওরা। বল দখল, ছন্দ, গতি; সবই ছিল তাদের পক্ষে। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো নির্মম। আধিপত্য সব সময় স্কোরবোর্ডে প্রতিফলিত হয় না।

হাইড্রেশন ব্রেকের পর সেই নির্মমতারই স্বাদ পেল ব্রাজিল। মাঝমাঠে একটি ভুল, আর সেখান থেকেই জন্ম নিল জাপানের স্বপ্ন। কাইশু সানো বল পেয়ে যেন বাতাসের গতিতে ছুটলেন। একের পর এক ব্রাজিলিয়ানকে পেছনে ফেলে বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জড়িয়ে দিলেন জালে। আলিসনের প্রসারিত হাতও থামাতে পারেনি সেই শিল্পসম গোল। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল ব্রাজিলিয়ান শিবির, আর উল্লাসে ফেটে পড়ল জাপান।

বিরতিতে পিছিয়ে থাকা ব্রাজিলের সামনে তখন দুটি পথ ছিল; হতাশায় ডুবে যাওয়া, অথবা নিজেদের ফুটবল দর্শনের প্রতি আস্থা রাখা। কার্লো আনচেলত্তির দল বেছে নিল দ্বিতীয় পথটি।

দ্বিতীয়ার্ধে যেন আরও ক্ষুধার্ত হয়ে মাঠে নামে ব্রাজিল। আক্রমণের ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়তে থাকে জাপানের রক্ষণে। কখনো সুজুকির দুর্দান্ত সেভ, কখনো গোললাইন থেকে ডিফেন্ডারের ক্লিয়ারেন্স; ভাগ্য যেন বারবার ব্রাজিলকে ফিরিয়ে দিচ্ছিল। তবু তারা থামেনি। কারণ সাম্বার সুর থেমে গেলে ব্রাজিল আর ব্রাজিল থাকে না।

অবশেষে ৫৬ মিনিটে প্রতীক্ষার অবসান। গ্যাব্রিয়েল মাগালাইয়েসের নিখুঁত ক্রসে কাসেমিরোর শক্তিশালী হেডে সমতায় ফেরে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। গোলটি ছিল শুধু স্কোরলাইন সমান করার নয়, বরং নতুন বিশ্বাসের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার।

এরপরও আক্রমণের ধার কমেনি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ব্রুনো গিমারায়েস, এন্দ্রিক; সবাই চেষ্টা করেছেন জাপানের রক্ষণভাগ ভাঙতে। প্রতিটি আক্রমণে মনে হচ্ছিল, গোলটি আসবেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা।

রেফারি ছয় মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ করলেন। সময় ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু ব্রাজিলের স্বপ্ন নয়। ইনজুরি টাইমের ষষ্ঠ মিনিটে ব্রুনো গিমারায়েসের বাড়ানো বল ধরে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি কোনাকুনি শট নিলেন। বল পোস্টে লেগে জড়িয়ে গেল জালে। সেই মুহূর্তে যেন পুরো স্টেডিয়াম সাম্বার ছন্দে নেচে উঠল।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ভেসে গেল ব্রাজিল। কারণ এই জয় শুধু তিন পয়েন্টের নয়; এটি বিশ্বাস, ধৈর্য আর নান্দনিক ফুটবলের জয়।

সবুজ গালিচায় সেদিন ব্রাজিল যেন রঙতুলি হাতে এক শিল্পী। প্রতিটি পাস ছিল তুলির আঁচড়, প্রতিটি আক্রমণ ছিল নতুন ক্যানভাস, আর শেষ মুহূর্তের গোলটি যেন সেই ছবির শেষ স্বাক্ষর। ফুটবল যে শুধু ফলাফলের খেলা নয়, এটি সৌন্দর্য, সাহস আর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার নাম; জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিল সেটিই আবারও মনে করিয়ে দিল।