ছবি: সংগৃহীত
আজতেকার গ্যালারিতে শেষ বাঁশি বাজতেই ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা উল্লাসে মেতে উঠলেন। আর গ্যালারির লাল-সবুজ জার্সিধারীরা নীরবে চোখ মুছলেন। স্কোরবোর্ড বলছে, ইংল্যান্ড ৩–২ গোলে জিতেছে। কিন্তু ৯০ মিনিটের ফুটবল যেন অন্য এক সত্য উচ্চারণ করছিল-মেক্সিকো হারেনি। তারা লড়েছে, বারবার ফিরে এসেছে, শেষ পর্যন্ত আশা ছাড়েনি। তাই এই রাত শুধু ইংল্যান্ডের জয় নয়, মেক্সিকোর অবিনাশী লড়াইয়েরও গল্প।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য সবকিছুই ছিল ইংল্যান্ডের দখলে। মাঝমাঠে জুড বেলিংহামের নিয়ন্ত্রণ, দ্রুতগতির আক্রমণ আর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ৩৬ ও ৩৮ মিনিটে দুই গোল করে ইংল্যান্ডকে স্বপ্নের সূচনা এনে দেন তিনি। বিশ্বকাপে চার ম্যাচ পর প্রথমবারের মতো গোল হজম করে মেক্সিকো। তাও নিজেদের দুর্গ আজতেকায়, যেখানে বিশ্বকাপে তারা কখনো হারেনি।
দুই গোল পিছিয়ে পড়েও ভেঙে পড়েনি স্বাগতিকরা। যেন সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তাদের পাল্টা লড়াই। ৪২ মিনিটে বক্সের ভেতরে তৈরি হওয়া সুযোগে হুলিয়ান কিনিয়োনেস গোল করে ব্যবধান কমিয়ে দেন। গ্যালারির হাজারো কণ্ঠ তখন আবার একসঙ্গে গর্জে ওঠে। ম্যাচে ফেরার বিশ্বাস ফিরে পায় মেক্সিকো।
সেই গোলের পর যেন একের পর এক ঢেউ তুলে ইংল্যান্ডের রক্ষণে আঘাত হানতে থাকে স্বাগতিকরা। প্রথমার্ধের বাকি সময়েই অন্তত দুটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল তারা। কিন্তু শেষ মুহূর্তের ফিনিশিং ব্যর্থতায় সমতায় ফেরা হয়নি। বিরতিতে তাই ২–১ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড, যদিও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিল মেক্সিকোর দিকে।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দেয় স্বাগতিকরা। ৫৪ মিনিটে জ্যারেল কোয়ানসা হেসুস গায়ার্দোকে ফাউল করে সরাসরি লাল কার্ড দেখলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ইংল্যান্ড। আজতেকা তখন যেন বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডকে নিজেদের অর্ধে আটকে ফেলেছিল মেক্সিকো। প্রতিটি আক্রমণে গ্যালারি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল-সমতার গোল আসছে।
কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো সবচেয়ে নিষ্ঠুর নাট্যকার। ম্যাচের স্রোত পুরোপুরি নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার মুহূর্তেই ৬০ মিনিটে পেনাল্টি উপহার দেয় মেক্সিকো। গোলরক্ষক রাউল রানহেল বক্সের ভেতরে অ্যান্থনি গর্ডনকে ফাউল করলে স্পটকিক থেকে হ্যারি কেইন ব্যবধান ৩–১ করেন। ম্যাচের চিত্রনাট্য যেন আবার ইংল্যান্ডের দিকে ঘুরে যায়।
তবু হাল ছাড়েনি মেক্সিকো। মাত্র আট মিনিট পর আবারও আক্রমণে উঠে আসে তারা। এবার ভুল করেন হ্যারি কেইন নিজেই। ব্রায়ান গুতিয়েরেজকে বক্সের ভেতরে ফাউল করে পেনাল্টি উপহার দেন ইংলিশ অধিনায়ক। স্পটকিক থেকে রাউল হিমিনেজ গোল করলে আবারও জেগে ওঠে আজতেকা। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩–২।
সেই গোলের পর ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে মেক্সিকো এগিয়ে যাওয়ার মতো তীব্রতায় আক্রমণ চালিয়ে যায়। প্রতিটি বল বক্সে ঢুকলেই গ্যালারি উঠে দাঁড়াচ্ছিল, প্রতিটি কর্নারে বাড়ছিল উত্তেজনা, প্রতিটি আক্রমণে মনে হচ্ছিল-এই বুঝি সমতা ফিরল। কিন্তু ভাগ্য আর ইংল্যান্ডের রক্ষণ শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি।
শেষ বাঁশি ইংল্যান্ডকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছে। কিন্তু আজতেকার রাত মনে রাখবে আরেকটি দলকেও-যারা শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছে, বারবার ফিরে এসেছে, আর প্রমাণ করেছে, কখনো কখনো পরাজিত দলই ম্যাচের সবচেয়ে বড় নায়ক হয়ে থাকে।