ভিনি, এন্ড্রিক, রায়ান ছবি সংগৃহীত
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে শেষ বাঁশি বাজতেই যেন থেমে গেল একটি প্রজন্মের গল্প। স্কোরবোর্ড বলছে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। কিন্তু সেই স্কোরবোর্ড কখনোই বলে না, এই ম্যাচে কতগুলো স্বপ্ন পোস্টের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, কতগুলো দীর্ঘশ্বাস গোলরক্ষকের গ্লাভসে আটকে গেছে, কিংবা কতবার হাজারো ব্রাজিলিয়ান সমর্থক আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আবার নিঃশব্দে বসে পড়েছেন।
এটি কেবল একটি পরাজয়ের গল্প নয়। এটি এমন এক রাতের গল্প, যেখানে গোলপোস্ট যেন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিল।
খেলার শুরু থেকেই ব্রাজিলকে দেখা গেছে অগোছালো ও ছন্দহীন। প্রতিপক্ষের শারীরিক উচ্চতা এবং লং পাসের বিপক্ষে শুরুতে বলের নিয়ন্ত্রণই নিতে পারছিল না সেলেসাওরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা ম্যাচে ফিরলেও বলের দখলে এগিয়ে ছিল নরওয়েই। নিজেদের রক্ষণভাগে বারবার ব্যাকপাস করে ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে তোলা এবং সুযোগ পেলেই লং পাসে বল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল এরলিং হলান্ড–এর কাছে; এটাই ছিল তাদের প্রধান কৌশল।
কিন্তু ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগ আসে পেনাল্টি পাওয়া থেকে। নরওয়ের ডিফেন্ডারের ভুলে পাওয়া সেই সুযোগে পুরো স্টেডিয়াম যেন গোলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। ব্রুনো গুইমারেস এগিয়ে এলেন। দৌড়ে এসে শট নিলেন। কিন্তু নরওয়ের গোলরক্ষক সঠিক দিক বুঝে বল ঠেকিয়ে দিলেন। এক মুহূর্তেই উল্লাস বদলে গেল স্তব্ধতায়।
সেই পেনাল্টি ছিল শুধু একটি শট নয়, পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়া একটি মুহূর্ত। গোলটি হলে ম্যাচের গল্প অন্যরকমও হতে পারত। কিন্তু ভাগ্য সেদিন ব্রাজিলের পাশে ছিল না।
পেনাল্টি মিসের পরও থেমে যায়নি ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বাম প্রান্ত দিয়ে একের পর এক দৌড়েছেন। তার পায়ের গতি বারবার নরওয়ের রক্ষণকে কাঁপিয়েছে। একটি আক্রমণে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নিচু শট নিলেও বল পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। আরেকবার গোলমুখে তার বিপজ্জনক ক্রসেও শেষ স্পর্শ দিতে পারেননি সতীর্থরা।
তরুণ প্রতিভাবান রায়ানও ডান প্রান্তে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন। ভেতরে কেটে এসে বাঁ পায়ের কার্লিং শট নিয়েছিলেন। বল গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেও ক্রসবারের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। সেই মুহূর্তে মাথায় হাত দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না ব্রাজিলিয়ানদের।
মধ্যমাঠ থেকে ক্যাসেমিরো একাধিকবার দূরপাল্লার পাসে আক্রমণ গড়েছেন। কর্নার থেকেও সুযোগ এসেছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত কিংবা নিখুঁত ফিনিশিংয়ের অভাব পুরো দলকে ভুগিয়েছে।
দ্বিতীয়ার্ধে আনচেলত্তি পরিবর্তনের পথ বেছে নেন। মাঠে নামেন এন্ড্রিক। মাত্র উনিশ বছরের এই তরুণ মাঠে নেমেই বুঝিয়ে দেন, ভবিষ্যৎ তার জন্য অপেক্ষা করছে।
একটি আক্রমণে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে একেবারে গোলরক্ষকের মুখোমুখি হয়ে যান এন্ড্রিক। পুরো স্টেডিয়াম তখন গোল দেখার অপেক্ষায়। কিন্তু শেষ শটটি গোলরক্ষকের শরীরে লেগে ফিরে আসে। আরেকবার বক্সের ভেতরে ঘুরে দাঁড়িয়ে নেওয়া তার শটও প্রতিহত হয়।
এ দুটি সুযোগই ছিল এমন, যা হয়তো অন্যদিন গোল হতো। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো নিষ্ঠুর। সেদিন সেই নিষ্ঠুরতার শিকার হন এন্ড্রিক।
এরপর মাঠে নামেন নেইমার। ইনজুরির কারণে পুরো টুর্নামেন্টে খুব বেশি সময় পাননি। কিন্তু মাঠে নামার পর কয়েক মিনিটেই আক্রমণে প্রাণ ফেরান। ছোট ছোট পাস, ড্রিবলিং আর থ্রু বল দিয়ে তিনি নরওয়ের ডিফেন্সে ফাঁক তৈরি করেন।
যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান কমান তিনি। কিন্তু সেই গোল আর ম্যাচে ফেরাতে পারেনি ব্রাজিলকে। এটি ছিল যেন বিদায়ের আগে কিংবদন্তির শেষ স্বাক্ষর।
ম্যাচ শেষে আনচেলত্তির কণ্ঠেও ছিল আক্ষেপ। তার মতে, দল যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু গোলে রূপ দিতে পারেনি। বাস্তবতাও তাই বলছে। নরওয়ে যেখানে দুটি বড় সুযোগ পেয়েছে, সেখানে দুটি গোল করেছে। আর ব্রাজিল অনেক বেশি সুযোগ পেয়েও সেগুলোকে স্মৃতিতে পরিণত করেছে।
তবে এই হারের দায় শুধু ফরোয়ার্ডদের নয়। পুরো টুর্নামেন্টেই ব্রাজিলের মধ্যমাঠ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ক্যাসেমিরো অভিজ্ঞতার ছাপ রাখলেও তার পাশে সৃজনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট ছিল। আক্রমণ ও রক্ষণে সংযোগ তৈরি করতে গিয়ে বারবার ছন্দ হারিয়েছে দল।
ব্রুনো গুইমারেস, জোয়াও গোমেস কিংবা অন্য মিডফিল্ডাররা পরিশ্রম করেছেন ঠিকই, কিন্তু এমন একজন ছন্দ নির্মাতা ছিল না, যিনি ম্যাচের কঠিন মুহূর্তে পুরো খেলাটির গতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেন। ব্রাজিলের ঐতিহ্যে যাদের নাম উচ্চারিত হয়; জিকো, সক্রেটিস, রিভালদো, কাকা কিংবা লুকা নয়, বরং নিজস্ব ছন্দের প্লেমেকারদের মতো একজন ফুটবলার; সেই শূন্যতাই যেন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণ হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। উত্তর অবশ্য সময়ই দেবে। কারণ ব্রাজিলের ফুটবল একাডেমিগুলোতে এখনও অসংখ্য প্রতিভা উঠে আসছে। আধুনিক ফুটবলে আরও সৃজনশীল, আরও গতিময় এবং আরও পরিণত একজন মিডফিল্ডার তৈরি করাই হয়তো হবে আগামী চার বছরের অন্যতম লক্ষ্য।
তবু এই বিশ্বকাপ ব্রাজিলকে শুধুই হতাশা দেয়নি।
ভিনি, রায়ান, কুনিয়া, এন্ড্রিক, দেখিয়েছেন ভয়ডরহীন ফুটবল। তাদের চোখে হার না মানার যে আগুন দেখা গেছে, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
একদিন যেমন রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা কিংবা নেইমারও তরুণ হিসেবেই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনই আজকের এই তরুণরাও হয়তো আগামী বিশ্বকাপের নায়ক হয়ে উঠবেন।
এই হার শুধু ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্নই শেষ করেনি, শেষ করেছে একটি যুগেরও। ম্যাচ শেষে আবেগঘন মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোরও ইঙ্গিত দেন নেইমার। বিশ্বকাপ ট্রফির স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেলেও দেশের হয়ে তাঁর অবদান, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত এবং প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার গল্প ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন মনে রাখবে।
ব্রাজিলের ইতিহাস বলে, এই দল কখনো দীর্ঘদিন পড়ে থাকে না। ১৯৮২-এর বেদনা পেরিয়ে এসেছে, ১৯৯৮-এর কান্না পেরিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছে, ২০১৪-এর দুঃস্বপ্নের পরও আবার নতুন স্বপ্ন বুনেছে। তাই ২০২৬-এর এই বিদায়ও হয়তো আরেকটি নতুন সূচনার নাম।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নেইমারের বিদায়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে। কিন্তু একই মাঠে এন্ড্রিকদের চোখে যে সাহস, যে ক্ষুধা, যে প্রতিজ্ঞা দেখা গেল; সেটিই বলে দেয়, ব্রাজিলের গল্প এখানেই শেষ নয়।
হয়তো মধ্যমাঠে নতুন এক শিল্পী আসবেন, আক্রমণে আরও পরিণত হবে তরুণরা, আর গোলের সামনে আজ যে সুযোগগুলো আক্ষেপ হয়ে রইল, সেগুলোই আগামী বিশ্বকাপে পরিণত হবে উল্লাসে।
কারণ ব্রাজিলের জার্সি শুধু পাঁচটি তারকার ইতিহাস বহন করে না; এটি বারবার হার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে নতুন করে বিস্মিত করারও প্রতীক।